প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সভ্যতার এই তুলনার সূচনা ১৯৯৩ সালে জিসিক সানোপ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য বইটি দিয়ে। এরপর যুক্তরাষ্ট্রে ২০০০ সালে প্রকাশিত হয় Understanding the Rise of China (চীনের উত্থান), আর ২০০২ সালে East and West: Taoism vs Judaism (প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য: দাওবাদ বনাম ইহুদি ধর্ম)। দাওবাদ ও ইহুদি ধর্ম বিষয়ক বইটি ২০১৫ সালে পোল্যান্ডে পোলিশ ভাষায় এবং ২০১৭ সালে চীনে চীনা ভাষায় অনূদিত হয়ে প্রকাশিত হয়েছে। ২০১৩ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ছয় বছর লেখক ইয়নসে বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক অধ্যয়নের স্নাতকোত্তর বিদ্যালয়ে “প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সভ্যতার তুলনামূলক অধ্যয়ন” (A Study of Eastern and Western Civilizations) নামে একটি পাঠক্রম পড়িয়েছেন। কোরিয়া, চীন, পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশ, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের ছাত্রছাত্রীরা তাতে অংশ নিয়েছিলেন। ক্লাসে তাঁদের সঙ্গে আলোচনার অনেকখানিই এই বইয়ে জায়গা পেয়েছে।
জীবনের শেষ পর্বে, ১৮৯৭ সালে তাহিতিতে আঁকা একটি ছবির নাম পল গগ্যাঁ দিয়েছিলেন “আমরা কোথা থেকে এসেছি, আমরা কী, আমরা কোথায় যাচ্ছি”। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য-এর তিনটি খণ্ডের নামও তেমনই: “আমরা কোথা থেকে এসেছি”, “আমরা কে” আর “আমরা কোথায় যাচ্ছি”। এই তিনটি প্রশ্ন মানুষের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে। এদের অনেক উত্তর দেওয়া হয়েছে, কিন্তু কোনোটিই চিরস্থায়ী হয়নি। এই বইও উত্তরহীন এক প্রশ্নের সামনে একটি প্রয়াস মাত্র।
কেন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য? প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সভ্যতার তুলনার মধ্যেই আমি এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে চেষ্টা করেছি। পঞ্চদশ শতকের আধুনিক যুগ পর্যন্ত প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য আলাদা আলাদা জগতে বাস করেছে। দুই সভ্যতার মধ্যে যখন কোনো আদানপ্রদান ছিল না, তখন তাদের তুলনার কোনো অর্থ ছিল না। তারপর পঞ্চদশ শতকের শেষে ভাস্কো দা গামা সরাসরি সমুদ্রপথ আবিষ্কার করলেন, আর প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সভ্যতার মধ্যে আদানপ্রদান শুরু হল। সপ্তদশ শতকে লাইবনিৎস প্রাচ্যের সভ্যতার ওপর বড় আশা রেখেছিলেন। তিনি দুই সভ্যতাকে পরস্পরের পরিপূরক বলে দেখতেন, যাদের একে অপরের কাছ থেকে শেখার আছে অনেক কিছু। তাঁর বিচারে পাশ্চাত্য এগিয়ে ছিল জ্যামিতি ও প্রকৃতিবিজ্ঞানে, আর প্রাচ্য এগিয়ে ছিল নৈতিকতায় এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে। তিনি মনে মনে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সভ্যতার মধ্যে এক সামঞ্জস্য ও পরিপূরকতার ছবি আঁকতেন। তাঁর ধারণা ছিল, পাশ্চাত্যের বৈজ্ঞানিক যুক্তিবোধ আর প্রাচ্যের নৈতিক প্রজ্ঞা যখন মিলবে, তখন গোটা মানবজাতিই লাভবান হবে।
কিন্তু অষ্টাদশ শতকের শিল্পবিপ্লবের পর পাশ্চাত্য যখন বিশ্বে আধিপত্য বিস্তার করল, তখন এই ইতিবাচক দৃষ্টি হারিয়ে গেল। পাশ্চাত্যের দার্শনিকেরা নতুন নতুন তত্ত্ব হাজির করলেন এবং প্রাচ্যের সভ্যতাকে “হেয় করার” কাজে অগ্রণী হলেন। হেগেল মনের বিকাশের মাত্রা অনুযায়ী বিশ্বের সভ্যতাগুলোকে “বিন্যস্ত” করলেন। তাঁর দর্শনে, প্রাচ্যের সভ্যতার মন নিম্নস্তরে রয়ে গেছে, তাই তা বিশ্বসভ্যতার ইতিহাসের প্রাথমিক দশা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি; আর মন ও স্বাধীনতাকে সামনে রাখা পাশ্চাত্যের সভ্যতা দাঁড়িয়ে আছে সবার আগে। বহু মানুষ হেগেলের ইতিহাস-দর্শনের সঙ্গে একমত হয়ে হেগেলবাদ (Hegelianism) নামের সেই চিন্তার অধীন হয়ে পড়লেন, যা সভ্যতা হিসেবে প্রাচ্যকে নিচে স্থান দেয়।
প্রায় দুই-তিন শতক ধরে চলা এই পাশ্চাত্যকেন্দ্রিক দৃষ্টান্তে একটি ব্যতিক্রম ঘটল। বিংশ শতকের শেষ ভাগে পূর্ব এশিয়া এমন বিস্ময়কর অর্থনৈতিক বিকাশ ঘটাল, যা পাশ্চাত্যের সমকক্ষ। এর সূত্র ধরে প্রাচ্যে তো বটেই, পাশ্চাত্যেও ধীরে ধীরে পূর্ব এশিয়ার সভ্যতা এবং তার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি আগ্রহ জন্মাল। একবিংশ শতকেও প্রাচ্যের উত্থান অব্যাহত থাকায় প্রাচ্যের সভ্যতার প্রতি আগ্রহ আরও বাড়ছে। পৃথিবী আজ যখন এক হয়ে গেছে, তখন ভবিষ্যতের জন্য প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সভ্যতার তুলনা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সভ্যতার তুলনায় সমস্যা অনেক। কোনো বৃহৎ আখ্যান নানা আপত্তি, ব্যাখ্যা আর তত্ত্বের জন্ম দেয়। এই বইয়ের বিষয়বস্তু নিয়ে অনেকে আপত্তি তুলতে পারেন যে এতে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের চিন্তাকে অতিরিক্ত দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে এবং অতি-সরলীকরণ করা হয়েছে। এমন পদ্ধতিকে মনে হতে পারে দুই সভ্যতার জটিলতা ও বৈচিত্র্য উপেক্ষা করে, আর প্রত্যেকের ভেতরের বিতর্ক ও পরিবর্তনের ধারা যথেষ্ট প্রতিফলিত করে না। এমন সমালোচনাও আসতে পারে যে পাশ্চাত্যের চিন্তাব্যবস্থা যে আদর্শ লক্ষ্যে পৌঁছানোর প্রচেষ্টার ফল, সে কথা এখানে যথেষ্ট ব্যাখ্যা করা হয়নি। দুই সভ্যতার মৌলিক চিন্তাগত পার্থক্য বোঝাতে গিয়ে পাশ্চাত্য দর্শনের বৈশিষ্ট্য ও ধারণাগুলোকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোয় আটকে রেখে সমালোচনা করা হয়েছে, এই অভিযোগও যুক্তিসংগত। দ্বিভাজনমূলক সরলীকরণ, ধারণার সীমিত ব্যাখ্যা, মানবস্বভাবের ব্যাখ্যা, পাশ্চাত্যের প্রতিষ্ঠান ও সেগুলোর পেছনের তত্ত্বের সীমাবদ্ধতা, এবং প্রত্যাদিষ্ট ধর্ম ও প্রকৃতি-দর্শনের তুলনা, এগুলোকে এই বইয়ের প্রধান দুর্বলতা বলে চিহ্নিত করা যেতে পারে।1
তবু দ্বিভাজন আর সরলীকরণের দুর্বলতা সত্ত্বেও প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সভ্যতার তুলনা আমরা চিরকাল এড়িয়ে যেতে পারি না। এই তুলনা শুরু করার সময় আমাদের হেগেলীয় পাশ্চাত্যকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। দুই সভ্যতা মৌলিকভাবেই আলাদা: মহাবিশ্ব ও প্রকৃতিকে দেখার ভঙ্গিতে, বিশ্বতত্ত্বে, মানুষের ঘটনাবলির ব্যাখ্যায়। হেগেলীয় বিরোধ এক সভ্যতার দিকে ঝুঁকে থেকে অন্যটিকে বিশ্লেষণ করার ভুলে পড়ে। শিল্পবিপ্লবের পরের পৃথিবী পাশ্চাত্যের বিস্তারের যুগ। তখন এই ধরনের হেগেলীয় তত্ত্বের চল ছিল। কিন্তু একবিংশ শতক এমন এক যুগ, যেখানে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সমানে সমানে মিশে যাচ্ছে। এখন দরকার হেগেলীয় বিরোধ নয়, লাইবনিৎসের মতো পরিপূরকতার বিশ্ববীক্ষা।
প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সভ্যতার প্রতিনিধিত্বকারী ধারণাগুলো ব্যাখ্যা করার অনেক উপায় আছে। সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা হল এগুলোকে আত্মরক্ষার (self-preservation) সহজাত প্রবৃত্তির প্রকাশ হিসেবে দেখা, যার সাহায্যে মানুষ প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের ভূরাজনৈতিক পরিবেশের মোকাবিলা করেছে। অর্থাৎ এগুলোকে মানুষের নিজস্ব মানবস্বভাবের ক্রিয়া হিসেবে দেখা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সভ্যতার চিন্তা ও দার্শনিক ভাবনা মানুষের সামর্থ্যের দুটি সম্ভাবনা আমাদের সামনে মেলে ধরে।
মানুষ হিসেবে চলতে গিয়ে পরিস্থিতি অনুযায়ী আমরা কখনো প্রাচ্যের মানুষের মতো বৈশিষ্ট্য দেখাই, কখনো পাশ্চাত্যের মানুষের মতো।2
দুই সভ্যতার শক্তির কথা বলতে হলে পাশ্চাত্যের উদ্যম আর প্রাচ্যের উদারতার কথা বলা যায়। গ্রিক-রোমান যুগ থেকে আধুনিক শিল্পবিপ্লব ও বিশ্বজয়ের যুগ পর্যন্ত পাশ্চাত্যের সভ্যতা উদ্যমকেই তার শক্তি করে তুলেছে। প্রাচ্য তার উদারতা দিয়ে ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক সফলভাবে সামলেছে। নিজের জিনিস অন্যের ওপর চাপিয়ে না দেওয়া, ধর্মযুদ্ধ বা মতাদর্শের যুদ্ধে জড়িয়ে না পড়া, এই উদারতাই প্রাচ্যের সভ্যতার শক্তি। আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই এই উদারতা আর উদ্যম দুটোই আছে। যুগ আর ব্যক্তিগত পরিস্থিতি অনুযায়ী মানুষ এই দুই বৈশিষ্ট্যই কাজে লাগায়। এবার সেই বৈশিষ্ট্যগুলো দেখা যাক।
অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে পূর্ব এশিয়া নিজেকে মেলে ধরছে। পাশ্চাত্যেও “প্রাচ্য” সম্পর্কে নতুন উপলব্ধি তৈরি হচ্ছে। সেখানে বিশ্লেষণ করা হয় যে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সভ্যতা ও দার্শনিক চিন্তার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য আছে, এবং সেই পার্থক্য চলে আসছে হাজার হাজার বছর ধরে।
মনোবিজ্ঞানীরা সর্বজনীনতার কথা বলেন, যে ধারণা গোটা মানবজাতিকে ধারণ করে; কিন্তু সাম্প্রতিক কালে অনেক গবেষক নতুন এক দৃষ্টিভঙ্গি হাজির করছেন। সেটি হল, পাশ্চাত্য (ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র, সেই সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও নিউজিল্যান্ড) আর পূর্ব এশিয়া (চীন, কোরিয়া, জাপান প্রভৃতি) হাজার হাজার বছর ধরে খুবই ভিন্ন চিন্তাব্যবস্থা বজায় রেখে এসেছে। 3
তাঁদের মূল্যায়নে, পূর্ব এশিয়া ২,৫০০ বছর আগেই পাশ্চাত্য থেকে আলাদা একটি সভ্যতা-বলয় গড়ে তুলেছিল, এবং সভ্যতার হিসাবে প্রাচ্যের জনসংখ্যা পাশ্চাত্যের প্রায় দ্বিগুণ।
পৃথিবীতে একশো কোটির বেশি মানুষ প্রাচীন গ্রিসের চিন্তাব্যবস্থা অনুসরণ করে। অন্যদিকে দুশো কোটির বেশি মানুষ ঐতিহ্যগতভাবে প্রাচীন চীনের চিন্তাব্যবস্থার উত্তরাধিকার বহন করে। গ্রিস ও চীনের চিন্তাব্যবস্থা ২,৫০০ বছর আগেই দার্শনিক বিশ্লেষণ ও কাঠামোর ভিত্তিতে গড়ে উঠেছিল। দুই সভ্যতার দর্শনব্যবস্থা খুবই আলাদা, আর তাদের সমাজকাঠামো এবং নিজেদের দিকে তাকানোর ভঙ্গিও আলাদা।4
বিশ্বসভ্যতার ব্যবস্থায় পূর্ব এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান আছে। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকের আশপাশেই পাশ্চাত্য ও প্রাচ্য খুবই ভিন্ন দুটি সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল। ওয়েলস “খ্রিস্টপূর্ব ২৫০ সালে আমাদের জানা পৃথিবী” নামে একটি মানচিত্র ও তার ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছেন। 5 সেই সময় ইউরেশিয়া মহাদেশ আর উত্তর আফ্রিকাই ছিল মানুষের জানা গোটা পৃথিবী। সভ্যতার দিক থেকে তা ভাগ হয়ে ছিল প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে।

পাশ্চাত্যের মানুষের জানা পৃথিবীর মধ্যে ছিল ইউরোপ, উত্তর আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও ভারত। প্রাচ্যের মানুষের জানা পৃথিবীর মধ্যে ছিল চীন, কোরিয়া ও জাপান।6 এই দুই সভ্যতা পরস্পরের সঙ্গে কোনো সাংস্কৃতিক যোগ ছাড়াই যার যার মতো স্বাধীনভাবে বিকশিত হয়েছে। এই দুই সভ্যতা কীভাবে আলাদা?
মানুষই একমাত্র প্রাণী, যার মন আছে। মনের কারণেই মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে, আমরা কে। আমরা কোথা থেকে এসেছি, আর কোথায় যাচ্ছি? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে মানুষ পরম সত্যের (Absolute Truth) সন্ধান শুরু করে। প্রাচ্য পরম সত্য খুঁজে পেয়েছে “প্রকৃতির দাও (道)”-এর মধ্যে। পাশ্চাত্য পরম সত্য খুঁজে পেয়েছে “লোকোত্তর ঈশ্বরের (神)” মধ্যে। দাও আর ঈশ্বর হল জগতে বিদ্যমান মাত্র দুটি পরম সত্য, একটি প্রকৃতির প্রতিনিধি, অন্যটি অতিপ্রাকৃতের। ফলে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যকে যে ধারণা সবচেয়ে গভীরভাবে আলাদা করে, তা হল প্রাচ্যের দাও আর পাশ্চাত্যের ঈশ্বরের ধারণা। এরাই বেড়ে উঠে পরিণত হয় প্রাচ্যের প্রকৃতি-দর্শনে আর পাশ্চাত্যের প্রত্যাদিষ্ট ধর্মে।
দাও আর ঈশ্বর, এই দুই পরম সত্যের ব্যাখ্যা পাওয়া যায় যথাক্রমে তাও তে চিং-এ আর তোরাহে (পুরাতন নিয়মের মোশির পাঁচ পুস্তক)। দুটিই প্রকৃতি ও মহাবিশ্বের উৎসে একই দুটি ভিত্তি স্থাপন করে: অসৎ (無) আর সৎ (有)। বিশ্বতত্ত্বের ভাষায় প্রশ্নটি হল, মহাশূন্য আর গ্রহ-নক্ষত্রের মধ্যে কোনটি মহাবিশ্ব গড়ে তোলে। তাও তে চিং আর তোরাহ অনুসারে, এই দুইয়ের মধ্যে দাও অসৎকে আর ঈশ্বর সৎকে মহাবিশ্বের উৎস বলে ধরে। এই উৎস স্থির হয়ে গেলে তার ভিত্তিতে মূল প্রশ্নগুলোর সমাধান এগোয়: প্রকৃতি ও মহাবিশ্বের নীতি কী। যদি এমন এক মহাবিশ্ব কল্পনা করা হয়, যেখানে মহাশূন্য আর গ্রহ-নক্ষত্র পরস্পরে রূপান্তরিত হয় ও বদলায়, তবে অসৎ ও সতের মধ্যকার “পরিবর্তনের দর্শন (變化論)” হয়ে ওঠে প্রাচ্যের মহাবিশ্বের নীতি। অন্যদিকে যদি এমন এক চিন্তা কল্পনা করা হয়, যেখানে কেবল গ্রহ-নক্ষত্রেরই অস্তিত্বের মূল্য আছে, তবে কেবল সৎই বিদ্যমান, এই “সত্তার দর্শন (存在論)” হয়ে ওঠে পাশ্চাত্যের মহাবিশ্বের নীতি।
মানুষ মহাবিশ্বের যে উৎস ও নীতি কল্পনা করে, তা স্বাভাবিকভাবেই মানুষের কর্মক্ষেত্র, অর্থাৎ মানবজীবনের ঘটনাবলির উৎস ও নীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। প্রাচ্যে মানবজীবনের উৎস হয় অসৎকে কেন্দ্র করে অকর্ম (উ ওয়েই, 無爲), আর পাশ্চাত্যে মানবজীবনের উৎস হয় সৎকে মূল বলে ধরা কর্ম (ইয়ু ওয়েই, 有爲)। তাও তে চিং-এ অকর্মকে দাওয়ের ক্রিয়ার উৎস হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, আর প্রত্যাদিষ্ট ধর্মে কর্ম প্রকাশ পায় ঈশ্বরের বিধান হিসেবে। প্রাচ্যের মহাবিশ্বের নীতি, পরিবর্তনের দর্শন, প্রাচ্যের মানবজীবনে হয়ে ওঠে নিত্য পরিবর্তনশীল “ইন ও ইয়াংয়ের তত্ত্ব”; আর পাশ্চাত্যের মহাবিশ্বের উৎস, সত্তার দর্শন, পাশ্চাত্যের মানবজীবনে হয়ে ওঠে অপরিবর্তনীয় “ভালো ও মন্দের তত্ত্ব”। মহাবিশ্ব ও মানবজীবনের এই প্রশ্নগুলোই প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সভ্যতার মর্মবস্তু। আর তাদের কেন্দ্রে, অক্ষ হয়ে, দাঁড়িয়ে আছে প্রাচ্যের দাও আর পাশ্চাত্যের ঈশ্বর।