1) দাও ছিল ঈশ্বরের আগে বনাম ঈশ্বর ছিলেন দাওয়ের আগে
প্রাচ্যের দাও-সভ্যতা বলে, দাও ছিল ঈশ্বরের আগে: “দাও ভূতপ্রেতকে দিব্য করেছে, শাংদিকে (上帝, ঊর্ধ্বলোকের প্রভু) দিব্য করেছে” (ঝুয়াংজি, অন্তর্গত অধ্যায়সমূহ)। ঈশ্বরের ধারণা গড়েছে প্রকৃতির মধ্যে বাস করা মানুষ। প্রকৃতিই দাও।29 প্রকৃতি (自然, জিরান) কথাটির অর্থ “যা নিজে থেকেই এমন”। প্রকৃতি অসীম ও চিরন্তন।
প্রকৃতি অসীম ও চিরন্তন। কেন প্রকৃতি অসীম ও চিরন্তন? কারণ প্রকৃতির কোনো উদ্দেশ্য নেই, কোনো কামনা নেই। (তাও তে চিং, অধ্যায় ৭)
গ্রিক দার্শনিক হেরাক্লিটাসের বিশ্বতত্ত্ব ছিল দাওয়ের দর্শনেরই মতো। তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন, মহাবিশ্ব, এই কসমস, ঈশ্বরের আগে থেকেই ছিল।
মহাবিশ্ব, এই কসমস, চিরন্তন; কোনো দেবতা বা মানুষ একে বানায়নি; এ সব সময় ছিল, আছে, থাকবে।30
বেকনের (১৫৬১–১৬২৬) মতো দার্শনিকেরা প্রকৃতিতে মুগ্ধ ছিলেন। মধ্যযুগের হাজার বছর ধরে পাশ্চাত্যে ঈশ্বরকে কেন্দ্রে না রাখা যেকোনো চিন্তা বা দর্শন নিষিদ্ধ ছিল। এর প্রভাবে বেকনকে সাবধানী না হয়ে উপায় ছিল না। ঈশ্বর আর প্রকৃতিকে না জুড়েই তিনি প্রকৃতির গুরুত্বকে সবচেয়ে জোরালো ভাষায় তুলে ধরেছেন।
মানুষ প্রকৃতির সেবক ও ব্যাখ্যাতা। মানুষের বোধশক্তির জন্ম কেবল প্রকৃতি নিয়ে চিন্তা আর তার সত্যের পর্যবেক্ষণ থেকে। এর বাইরে মানুষ কিছুই জানতে পারে না, কিছুই করতেও পারে না।31
বেকনের পর প্রকৃতির গুরুত্ব চূড়ান্ত প্রকাশ পায় দার্শনিক স্পিনোজার (১৬৩২–১৬৭৭) মধ্যে। স্পিনোজা ঈশ্বরকে প্রকৃতি হিসেবে দেখতেন। পাশ্চাত্যের মধ্যযুগীয় দর্শন যেহেতু ঈশ্বরকেন্দ্রিক, তাই স্পিনোজা প্রকৃতির আলোয় ঈশ্বরকে ব্যাখ্যা করেন। ঈশ্বর আর প্রকৃতিকে যুক্ত করে তিনি প্রকৃতিকে তাঁর দর্শনের কেন্দ্রে বসান।
প্রকৃতি কোনো উদ্দেশ্যের জন্য ক্রিয়া করে না। যে চিরন্তন সত্তাকে আমরা ঈশ্বর বা প্রকৃতি বলি, সে যে অনিবার্যতায় বিদ্যমান, ঠিক সেই অনিবার্যতাতেই ক্রিয়া করে… প্রকৃতি কোনো উদ্দেশ্যের জন্য বিদ্যমান নয়। তার ক্রিয়াও তেমনই। তার অস্তিত্বের মতো তার ক্রিয়ারও কোনো মূলনীতি বা উদ্দেশ্য নেই।32
পাশ্চাত্যের প্রত্যাদিষ্ট ধর্ম “সূচনা”কে মহাবিশ্বের মর্মবস্তু করে তোলে। সূচনার ধারণার মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই উদ্দেশ্যবাদ ধরা থাকে। বার্ট্রান্ড রাসেল এ কথা এভাবে বলেছেন: জগতের কোনো সূচনা ছিল বলে মনে করার কোনো কারণই নেই; জগতের একটা সূচনা থাকতেই হবে, এই ধারণা আসলে আমাদের কল্পনাশক্তির দৈন্য থেকে আসে। তাও তে চিং-এর মতোই তাঁর ছিল এক প্রকৃতি-দার্শনিক তত্ত্ব: “প্রকৃতির কোনো উদ্দেশ্য নেই”।
প্রকৃতির নিজস্ব কোনো উদ্দেশ্য নেই… চূড়ান্ত উদ্দেশ্য নিছকই মানুষের কল্পনার সৃষ্টি। 33
প্রাচ্যের দাওয়ের এই দৃষ্টিভঙ্গি, আর পাশ্চাত্যে হেরাক্লিটাস, বেকন, স্পিনোজা ও রাসেলের দৃষ্টিভঙ্গি, সবগুলোকেই প্রকৃতিকেন্দ্রিক প্রকৃতি-দর্শন বলে বর্ণনা করা যায়। এর থেকে আলাদা এক মহাবিশ্ব-ধারণা পাশ্চাত্যে বিস্তার লাভ করে, যা প্রত্যাদিষ্ট ধর্মের দাবি। পাশ্চাত্যে বলা হয়, ঈশ্বর যেহেতু প্রকৃতি সৃষ্টি করেছেন, তাই ঈশ্বর প্রকৃতির আগে ছিলেন। ঈশ্বর আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন বলে পাশ্চাত্য মনে করে, ঈশ্বরের সৃষ্টির আগে প্রকৃতি ছিল না। ঈশ্বরের সৃষ্ট পৃথিবীই মহাবিশ্বের কেন্দ্র, আর মানুষ তার মাঝখানে। মোশির পাঁচ পুস্তকের আদিপুস্তকে আছে ঈশ্বর কীভাবে কিছুই-না, অর্থাৎ অসৎ (無) থেকে আকাশ ও পৃথিবী, প্রকৃতি আর মানুষ সৃষ্টি করে সতের (有) জগতে প্রবেশ করলেন, তার বিবরণ।
আদিতে ঈশ্বর আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করলেন। (আদিপুস্তক ১:১)
পৃথিবী ছিল আকারহীন ও শূন্য, অতল জলরাশির ওপর ছিল অন্ধকার, আর ঈশ্বরের আত্মা জলের ওপর বিচরণ করছিলেন।
ঈশ্বর বললেন, “আলো হোক”, আর আলো হল। ঈশ্বর দেখলেন, আলো ভালো; ঈশ্বর আলো আর অন্ধকারকে আলাদা করলেন। ঈশ্বর আলোর নাম দিলেন দিন, আর অন্ধকারের নাম দিলেন রাত। সন্ধ্যা হল, সকাল হল; এই হল প্রথম দিন। (আদিপুস্তক ১:২-৫)
বাইবেল অনুসারে ঈশ্বর ছয় দিনে মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেন। সৃষ্টির ক্রম এই: প্রথম দিন, আলো। দ্বিতীয় দিন, আকাশ। তৃতীয় দিন, সমুদ্র, স্থল আর উদ্ভিদ। চতুর্থ দিন, সূর্য, চাঁদ আর তারা। পঞ্চম দিন, মাছ আর পাখি। ষষ্ঠ দিন, স্থলচর প্রাণী আর মানুষ (মানুষকে গড়া হয়েছিল ঈশ্বরের প্রতিমূর্তিতে)। আর সপ্তম দিনে তিনি বিশ্রাম নেন। এভাবে জগৎ বিশৃঙ্খলা থেকে শৃঙ্খলায়, আদিম বিশৃঙ্খলা থেকে সুবিন্যস্ত জগতে পৌঁছায়। এই সৃষ্টি সম্পন্ন হয় ঈশ্বরের “বাক্যে”।
চীনেও আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টির পুরাণ আছে। পানগু (盤古) নামের এক সত্তা বিশাল এক কুঠার দিয়ে আদিম বিশৃঙ্খলাকে চিরে আকাশ আর পৃথিবীকে আলাদা করেন। তারপর আঠারো হাজার বছর ধরে আকাশকে ঠেলে ধরে রেখে তিনি বেড়ে ওঠেন, তারপর মারা যান, আর তাঁর দেহ পরিণত হয় প্রকৃতিতে। 34 তাঁর চোখ হল সূর্য আর চাঁদ, নিঃশ্বাস হল বাতাস আর মেঘ, কণ্ঠস্বর হল বজ্র, রক্ত হল নদী আর সাগর, হাড় হল পর্বতমালা, লোম হল ঘাস আর গাছপালা, ঘাম হল বৃষ্টি, আর তাঁর গায়ের পিসুরা হল পশুপাখি আর মানুষ।
আদিতে ছিলেন পানগু নামের এক দেবতা… মৃত্যুর সময় এলে তাঁর দেহ প্রকৃতিতে পরিণত হল… তাঁর চুল আর লোম হল ঘাস আর গাছ, তাঁর চোখ হল সূর্য আর চাঁদ… তাঁর দেহে বাস করা পিসুরা হল পৃথিবীর নানা প্রাণী আর মানুষের নানা জাতি।35
ঈশ্বরের দেহ প্রকৃতির নানা অংশে পরিণত হয়েছে, এই ভাবনা হুবহু প্রকাশ পেয়েছে ইহুদি কাব্বালা (Kabbalah) দর্শনের অন্যতম প্রধান ধারণায়, যে দর্শন স্পিনোজাকে প্রভাবিত করেছিল: কাব্বালার সংকোচন, অর্থাৎ ৎসিমৎসুমের (Tzimtzum) ধারণা।36 এটি বলে, “ঈশ্বর নিজের অসীমতাকে সংকুচিত করে জগৎ সৃষ্টি করেন”; পানগুর সৃষ্টি-পুরাণের সঙ্গে এই সৃষ্টির ধারণা খুবই মেলে। (এই ধারা ধরেই স্পিনোজা পৌঁছান এই সিদ্ধান্তে যে “ঈশ্বর আর প্রকৃতি অভিন্ন”।)
এই পুরাণ অনুসারে পানগু প্রকৃতিতে পরিণত হয়েছিলেন ১৮,০০০ বছর আগে। আদিপুস্তকের ঈশ্বর প্রকৃতি সৃষ্টি করেছিলেন কবে? পানগুর পুরাণের মতো নয়, সৃষ্টির সভ্যতা পাশ্চাত্যে ঈশ্বর কীভাবে মহাবিশ্ব সৃষ্টি করলেন তার বিস্তারিত বিবরণ লিপিবদ্ধ আছে। পাশ্চাত্যের দার্শনিকেরা হাজার হাজার বছর তা বিশ্বাস করেছেন, আর কিছুকাল আগেও তাঁরা প্রকৃতি সৃষ্টির “তারিখ” হিসাব করতেন। ছয় দিনের সৃষ্টির পর প্রথম মানুষ আদম ৯৩০ বছর বেঁচেছিলেন, আর তাঁর বংশধরেরা প্রত্যেকে কত বছর বেঁচেছিলেন, সবই লেখা আছে (আদিপুস্তক ৫)। নূতন নিয়মের সুসমাচারেও অব্রাহাম থেকে যিশু পর্যন্ত বংশতালিকা বিস্তারিত লেখা আছে (মথি ১:১-১৭)।
বাইবেলের বিবরণ ধরে পাশ্চাত্যের দার্শনিকেরা আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি থেকে যিশুর জন্ম পর্যন্ত তারিখ হিসাব করেন। এই হিসাব অনুযায়ী সৃষ্টি ঘটেছিল খ্রিস্টপূর্ব ৪০০০ সালের কাছাকাছি। এই হিসাব চলতেই থাকে, আর আদি মধ্যযুগে একেবারে নির্দিষ্ট তারিখ পর্যন্ত প্রস্তাব করা হয়। পাশ্চাত্যে সৃষ্টির তারিখের হিসাব নানা দার্শনিকের হাতে সপ্তদশ শতক পর্যন্ত চলেছে। এই চিন্তাধারা মিলিয়ে যায় আলোকায়নের যুগের দেববাদ (理神論, Deism) আর বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে। দেববাদ বলে, লোকোত্তর ঈশ্বর প্রকৃতি সৃষ্টির পর মানুষের ঘটনাবলিতে আর হস্তক্ষেপ করেন না।37 দেববাদ আস্তিক্যবাদের নবী, অলৌকিক ঘটনা ইত্যাদি অস্বীকার করে, কিন্তু ঈশ্বর প্রকৃতি সৃষ্টি করেছেন, এ কথায় আস্তিক্যবাদের সঙ্গে তার কোনো পার্থক্য নেই।
দাও আর ঈশ্বরের মধ্যে কে আগে ছিল, এই প্রশ্নের উত্তরে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য ভিন্ন বিশ্বতত্ত্বে পৌঁছায়। এখান থেকেই প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সভ্যতার কাঠামো আলাদা হয়ে যায়। এই প্রশ্ন সরাসরি জড়িত প্রাকৃতিক ঘটনার ব্যাখ্যার সঙ্গে, মানুষ মহাবিশ্বকে কীভাবে ব্যাখ্যা করে তার সঙ্গে। সূর্যকেন্দ্রিক আর ভূকেন্দ্রিক তত্ত্ব এখানে জড়িয়ে আছে।
প্রত্যাদিষ্ট ধর্মের ভূকেন্দ্রিক তত্ত্ব বনাম প্রকৃতি-দর্শনের সূর্যকেন্দ্রিক তত্ত্ব
তাও তে চিং-এ লেখা আছে, “প্রকৃতি ও মহাবিশ্ব ঈশ্বরের আগে ছিল” (তাও তে চিং, অধ্যায় ৪ ও ২৫)। অন্যদিকে পাশ্চাত্যে লেখা আছে, “আদিতে ঈশ্বর আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করলেন”, অর্থাৎ ঈশ্বর প্রকৃতি ও মহাবিশ্বের আগে ছিলেন (আদিপুস্তক ১:১)। এখান থেকেই মানুষ কে, এই প্রশ্নের উত্তরে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়। বিশ্বতত্ত্বের দিক থেকে দেখলে পাশ্চাত্যের সৃষ্টিবাদ দাঁড়িয়ে আছে ভূকেন্দ্রিক তত্ত্বের ওপর, অর্থাৎ মানুষ যে পৃথিবীতে বাস করে তা-ই মহাবিশ্বের কেন্দ্র। অর্থাৎ ভূকেন্দ্রিক তত্ত্ব সৃষ্টিবাদের মধ্যেই নিহিত। অন্যদিকে প্রাচ্যের প্রকৃতি-দর্শন মেনে নেয় যে মহাবিশ্বই কেন্দ্র, আর মানুষ তার একটি অংশ মাত্র।
গির্জার প্রভাবে পাশ্চাত্যের মানুষকে শেখানো হয়েছিল সৃষ্টির এই বিবরণগুলো একটি অক্ষরেও সন্দেহ না করে হুবহু বিশ্বাস করতে। তাই সপ্তদশ শতকের শেষ ভাগে আলোকায়নের যুগ পর্যন্ত প্রায় সব পাশ্চাত্যবাসী সৃষ্টিবাদে দৃঢ় বিশ্বাস রাখত। আর এই সৃষ্টিবাদের ভিত্তিতে ধরে নেওয়া হয়েছে যে ঈশ্বর প্রকৃতিকে গড়েছেন মানুষ যাতে খুশিমতো তার ওপর কর্তৃত্ব করতে পারে। পাশ্চাত্যের মানুষ নিজেদের বিশ্বাস করে এসেছে এমন সত্তা হিসেবে, যারা “ঈশ্বরের প্রতিমূর্তিতে গড়া মানুষ, সমুদ্রের মাছ, আকাশের পাখি, মাটিতে বুকে-হাঁটা সবকিছু আর গোটা পৃথিবীর ওপর কর্তৃত্ব করার জন্য”। প্রত্যাদিষ্ট ধর্মের ভূকেন্দ্রিক তত্ত্ব (天動說) বিশ্বাস করত যে পৃথিবী আর মানুষই জগতের কেন্দ্র, আর মহাবিশ্ব পৃথিবীর চারপাশে ঘোরে। এ কারণেই যিহোশূয়ের মতো ঈশ্বরের কাছে সূর্যকে থামিয়ে দেওয়ার প্রার্থনা করা সম্ভব হয়েছিল:
তিনি ইস্রায়েলের সামনে চিৎকার করে বললেন, “সূর্য, গিবিয়োনের ওপর স্থির হয়ে থাকো; চাঁদ, অয়ালোন উপত্যকার ওপর থেমে থাকো।” তখন যতক্ষণ না জাতি শত্রুদের ওপর প্রতিশোধ নিল, ততক্ষণ সূর্য স্থির হয়ে রইল, চাঁদ থেমে রইল… প্রায় সারা দিন সূর্য আকাশের মাঝখানে থেমে রইল, অস্ত যেতে তাড়া করল না। প্রভু মানুষের কথা সেদিনের মতো আর কখনো শোনেননি, আগেও না, পরেও না। (যিহোশূয় ১০:১২-১৪)
ষোড়শ শতক পর্যন্ত পাশ্চাত্যের মানুষ অ্যারিস্টটল ও টলেমির ভূকেন্দ্রিক তত্ত্ব সমর্থন করত; তারা ভাবত, পৃথিবী জগতের কেন্দ্র, আর জ্যোতিষ্কগুলো তার চারদিকে ঘোরে। এই অনুমান মোশির পাঁচ পুস্তকের আদিপুস্তকে সৃষ্টির বর্ণনার সঙ্গে মিলে যেত। সৃষ্টিবাদ অনুসারে ঈশ্বর মানুষকে সৃষ্টি করার সময় তাকে একটি উদ্দেশ্য দিয়েছিলেন। পাশ্চাত্যের সৃষ্টিবাদে ঈশ্বর মানুষকে প্রকৃতির ওপর কর্তৃত্বের অধিকার দিয়েছেন বলে মানুষ দাঁড়ায় মহাবিশ্বের কেন্দ্রে। মানুষ জন্মায় একটি স্পষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে: প্রকৃতির ওপর কর্তৃত্ব আর ঈশ্বরের উপাসনা। তাই গ্রিক-রোমানরা আর মধ্যযুগের পাশ্চাত্যবাসীরা এই দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে বেঁচেছিল যে তারাই মহাবিশ্বের কেন্দ্র।
মানুষ মহাবিশ্বের কেন্দ্র, গ্রিক-রোমানদের এই ধারণায় সমুদ্রযাত্রা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জ্যোতিষ্কদের গতি পর্যবেক্ষণ না করে সমুদ্রযাত্রা সম্ভব নয়। মানুষকে কেন্দ্রে রেখে পৃথিবী মহাবিশ্বের একেবারে মাঝখানে, আর জ্যোতিষ্কেরা পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘোরে, এভাবেই মহাবিশ্বের ছবি আঁকার চেষ্টা হয়েছিল। এটাই বাইবেল, অ্যারিস্টটল প্রমুখের সমর্থিত “পৃথিবীকেন্দ্রিক বিশ্বদৃষ্টি”, অর্থাৎ ভূকেন্দ্রিক তত্ত্ব। তখনকার বেশির ভাগ পাশ্চাত্যবাসী যে ভূকেন্দ্রিক তত্ত্বে বিশ্বাস করত, তাতে ধরা হত পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্রে স্থির হয়ে আছে, আর সূর্যসহ সব জ্যোতিষ্ক তার চারদিকে ঘোরে।
এই ভূকেন্দ্রিক তত্ত্ব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে তাঁদের হাতে, যাঁরা আকাশ পর্যবেক্ষণ করতেন আর প্রকৃতিকে খুঁটিয়ে দেখতেন। এল সূর্যকেন্দ্রিক তত্ত্ব। পাশ্চাত্যে মধ্যযুগ থেকে আধুনিক যুগে প্রবেশের কালে প্রকৃতি আর মানুষের সম্পর্ক নিয়ে মানবজাতির চিন্তার সামর্থ্যে এক চূড়ান্ত পরিবর্তন আসে। কারণ মানুষ আর প্রকৃতির সম্পর্ককে গোড়া থেকে সংশোধন করার একটি সুযোগ তৈরি হয়েছিল। ভূকেন্দ্রিক থেকে সূর্যকেন্দ্রিক তত্ত্বে রূপান্তর ঘটে গেল। আকাশে সূর্যকে থামিয়ে দেওয়া যিহোশূয়ের অলৌকিক ঘটনা ষোড়শ-সপ্তদশ শতকে প্রশ্নের মুখে পড়ে। কোপারনিকাস (Copernicus, ১৪৭৩–১৫৪৩), কেপলার (Kepler, ১৫৭১–১৬৩০) আর গ্যালিলিওর (Galileo, ১৫৬৪–১৬৪২) জ্যোতির্বিজ্ঞানের পর্যবেক্ষণে প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে হাজির হয় “সূর্যকেন্দ্রিক বিশ্বদৃষ্টি”, অর্থাৎ সূর্যকেন্দ্রিক তত্ত্ব (地動說)। তাঁরা বললেন, পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্র নয়, পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র করে তার চারপাশে ঘোরে।
তাঁদের তুলে ধরা বৈজ্ঞানিক তথ্যও ভূকেন্দ্রিক তত্ত্বের পক্ষের ধর্মের প্রভাবে দীর্ঘকাল প্রশ্নের মুখে ছিল। পাশ্চাত্যের ইতিহাসে গভীরে প্রোথিত দর্শনব্যবস্থাকে উল্টে দেওয়া বিজ্ঞানের অগ্রগতির পক্ষে সহজ ছিল না। সূর্যকেন্দ্রিক তত্ত্ব পাশ্চাত্যের বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে বেশ ছড়িয়ে পড়ার পরও ধর্মসংস্কার আন্দোলনের অগ্রনায়ক লুথার তখনো শাস্ত্রের কর্তৃত্বের ওপর ভর করে ভূকেন্দ্রিক তত্ত্বের পক্ষে বলতেন। মার্টিন লুথার কোপারনিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক তত্ত্বের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন:
কোপারনিকাস এক ভুঁইফোঁড় জ্যোতিষী। এই নির্বোধ গোটা জ্যোতির্বিদ্যাকে উল্টে দিতে চায়। কিন্তু শাস্ত্র আমাদের শেখায়, যিহোশূয় থামতে আদেশ দিয়েছিলেন সূর্যকে, পৃথিবীকে নয়। 38
ঈশ্বর পৃথিবী আর মানুষকে বিশেষভাবে সৃষ্টি করেছেন, বাইবেলের এই ধর্মমতের মধ্যে নিহিত “পৃথিবীকেন্দ্রিক বিশ্বদৃষ্টি”কে সূর্যকেন্দ্রিক তত্ত্ব অস্বীকার করল। এটা ছিল বাইবেলের ভূকেন্দ্রিক তত্ত্বকে নাড়িয়ে দেওয়া এক বিরাট ঘটনা। বাইবেল ও গির্জা কখনো ভুল করেনি, এই অভ্রান্ততা (無謬性), আর তারা ভুল করতেই পারে না, এই নির্ভুলতা (無誤性), দুটিকেই ভ্রান্ত বলে দেখিয়ে দেওয়া এ ছিল এক প্রলয়ংকর ঘটনা।
সূর্যকে কেন্দ্র করে পৃথিবী ঘোরে, তাঁদের পর্যবেক্ষণের এই ফলকে রোমের পোপের দরবার মরিয়া হয়ে দমন করে। কারণ ভূকেন্দ্রিক তত্ত্ব অনুযায়ী ঈশ্বর সূর্যকে থামিয়েছিলেন; কিন্তু তাঁদের সূর্যকেন্দ্রিক তত্ত্ব মানলে সূর্য তো স্থিরই, থামাতে হত পৃথিবীর আবর্তন। তখনকার দিনে এটা আকাশ উল্টে দেওয়ার মতো গুরুতর প্রশ্ন ছিল। পাশ্চাত্যের মানুষ সবাই শাস্ত্রের নির্ভুলতায় দৃঢ় বিশ্বাস রাখত, আর তার বিরুদ্ধে যায় এমন যেকোনো বক্তব্য সঙ্গে সঙ্গে ধর্মীয় বিচারসভার (ইনকুইজিশন) আওতায় পড়ত। কারণ শাস্ত্রের নির্ভুলতা যদি বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণে প্রতিষ্ঠিত তথ্যের ভিত্তিতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে, আর একটি জায়গাতেও ভুল স্বীকার করা হয়, তবে তা বাঁধভাঙা জলের মতো কাজ করবে, আর শাস্ত্রের নির্ভুলতার নীতি ভেঙে পড়বে। দীর্ঘ সংগ্রামের পরেই কেবল সূর্যকেন্দ্রিক তত্ত্ব কোনোমতে তথ্য হিসেবে নিজের জায়গা পায়। জ্যোতিষ্কদের গতি নিয়ে তাঁদের সূর্যকেন্দ্রিক তত্ত্ব প্রত্যাদিষ্ট ধর্মের ধর্মমত থেকে নয়, প্রকৃতির পর্যবেক্ষণ থেকে এসেছিল।
ভূকেন্দ্রিক তত্ত্বের বিপরীতে সূর্যকেন্দ্রিক তত্ত্ব খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকেই উত্থাপিত হয়েছিল, কিন্তু প্রায় দুহাজার বছর ইতিহাসের তলায় চাপা পড়ে, তার অস্তিত্বই অজানা থেকে যায়; পুনরাবিষ্কৃত হয় কেবল রেনেসাঁসের কালে এসে। পাশ্চাত্যে খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে তখনকার পাশ্চাত্য জগতের কেন্দ্র আলেকজান্দ্রিয়ায় জ্যামিতি আর জ্যোতির্বিজ্ঞানের পর্যবেক্ষণ খুব সক্রিয়ভাবে চলত। অ্যারিস্টার্কাস (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩১০–২৩০) পৃথিবী থেকে চাঁদের আর পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব বাস্তবসম্মতভাবে হিসাব করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, খালি চোখে চাঁদ আর সূর্যকে সমান আকারের দেখালেও সূর্য দূরে আছে বলে তা চাঁদের চেয়ে বিশ গুণেরও বেশি বড়। এরাটোস্থেনিস (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২৭৬–১৯৫) খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকেই পৃথিবীর পরিধি প্রায় নির্ভুলভাবে মেপেছিলেন। তিনি জানতেন যে পৃথিবী গোল, আর তিনিই অধিবর্ষের বাড়তি দিনের উদ্ভাবক বিজ্ঞানী। এভাবে তাঁরাই মানব-ইতিহাসে প্রথম সূর্যকেন্দ্রিক তত্ত্ব উত্থাপন করেন। কিন্তু ভূকেন্দ্রিক তত্ত্বে দৃঢ় বিশ্বাসী তখনকার দার্শনিকেরা তাঁদের সূর্যকেন্দ্রিক তত্ত্বকে ধর্মদ্রোহী বলে নিন্দা করেন।
ভূকেন্দ্রিক আর সূর্যকেন্দ্রিক তত্ত্বের এই পার্থক্যের মধ্যে নিহিত ছিল এমন এক গুরুতর দৃষ্টান্ত-পরিবর্তন, যা সবকিছু বদলে দিতে পারত: মানুষের মহাবিশ্ব-ধারণা, মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক, মহাবিশ্বে মানুষের স্থান, জীবনের উদ্দেশ্য। কিন্তু অ্যারিস্টার্কাসের সূর্যকেন্দ্রিক তত্ত্ব তাঁর যুগের প্রয়োজনের তুলনায় অনেক এগিয়ে ছিল। ভূকেন্দ্রিক তত্ত্বের কার্যকারিতার কাছে হেরে সূর্যকেন্দ্রিক তত্ত্বকে প্রায় দুহাজার বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল: যতদিন না ১৪৯২ সালে কলম্বাস আটলান্টিক পেরিয়ে আমেরিকায় পৌঁছান, ১৪৯৭ সালে ভাস্কো দা গামা ভারত মহাসাগর হয়ে প্রাচ্যে পৌঁছান, আর ১৫১৯ থেকে ১৫২২ সালের মধ্যে ম্যাগেলান ও এলকানো আটলান্টিক আর প্রশান্ত মহাসাগর পেরিয়ে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করেন।
ভূকেন্দ্রিক আর সূর্যকেন্দ্রিক তত্ত্বকে ঘিরে এই ঘটনাপ্রবাহ তথাকথিত সত্য বা দৃষ্টান্তের “প্রাসঙ্গিকতা” সম্পর্কে অনেক কিছু বলে। মানুষের কর্মকাণ্ডে তার প্রয়োজন দেখা না দেওয়া পর্যন্ত সত্য প্রাসঙ্গিকতা পায় না। দর্শনও এর ব্যতিক্রম নয়। ইতিহাস মানুষকে তার প্রয়োজন অনুভব না করানো পর্যন্ত দর্শন সত্যের সঙ্গে মিলুক বা না মিলুক, প্রাসঙ্গিকতা পায় না।
সমুদ্র-অভিযান যে সূর্যকেন্দ্রিক তত্ত্বকে বাস্তব প্রয়োজনে পরিণত করেছিল, কোপারনিকাস, কেপলার, গ্যালিলিও প্রমুখ সূর্যকে কেন্দ্র করে পৃথিবীর ঘোরার পর্যবেক্ষণফল প্রকাশ করতে থাকায় তা ধীরে ধীরে তথ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়। সূর্যকেন্দ্রিক তত্ত্ব মানুষের মহাবিশ্ব-ধারণাসহ গোটা চিন্তাজগতে দৃষ্টান্ত-পরিবর্তন ঘটায়। মহাবিশ্ব কত বিশাল? মহাবিশ্বের কি কোনো উদ্দেশ্য আছে? মহাবিশ্ব কোথা থেকে এল? কীভাবে চলে? কোথায় যাচ্ছে? এসব মহাজাগতিক প্রশ্ন নিয়ে আমরা কিছুই জানি না।39
ভূকেন্দ্রিক-সূর্যকেন্দ্রিক তত্ত্বের প্রশ্নে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিল কেবল পৃথিবীর, অর্থাৎ প্রকৃতির সৃষ্টিতত্ত্ব; মানুষের সৃষ্টিতত্ত্ব নিরাপদে পার পেয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ঊনবিংশ শতকে এই অবস্থা আবার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। সেই চ্যালেঞ্জ এসেছিল ডারউইনের বিবর্তনবাদ থেকে। ডারউইন বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে দেখালেন, বাইবেলে যেমন বলা হয়েছে তেমন করে ঈশ্বর কাদামাটি দিয়ে মানুষকে গড়েননি; মানুষ অন্য প্রাণী থেকে বিবর্তিত হয়ে এসেছে। এর ফলে বাইবেলের মানবকেন্দ্রিক সৃষ্টিবাদ আর বিশ্বদৃষ্টির মূল তত্ত্ব আবারও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।
2) দাও হল প্রকৃতি বনাম ঈশ্বর হলেন অতিপ্রাকৃত
দাও প্রকৃতির নিয়ম, আর ঈশ্বর এক অতিপ্রাকৃত সত্তা। দাও প্রকৃতিকে আদর্শ মানে (道法自然), প্রকৃতিকে প্রকাশ করে। দাও মানেই প্রকৃতি। অতিপ্রাকৃত অলৌকিকতা স্বীকার করা “প্রত্যাদিষ্ট ধর্মের” তুলনায়, প্রাচ্যের সভ্যতাকে যে দাও পরিচালনা করে তা প্রকৃতিকে প্রকাশ করা এক “প্রকৃতি-দর্শন”। প্রকৃতির নিয়ম যে দাও, তা প্রকৃতি ও মহাবিশ্বের নিয়মকে অতিক্রম করে যাওয়া কোনো সত্তার কথা ভাবে না। স্বাভাবিকভাবেই প্রকৃতি-দর্শনের ওপর ভর করা প্রাচ্যের সভ্যতায় অতিপ্রাকৃত ধর্ম জন্মায় না।40 আজও কোরিয়া ছাড়া পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে খ্রিস্টধর্মসহ প্রত্যাদিষ্ট ধর্মে বিশ্বাসী মানুষ জনসংখ্যার মোটামুটি ২-৩ শতাংশ।
তাও তে চিং-এ কোনো অতিপ্রাকৃত দেবতার উল্লেখ বা বিশ্লেষণ নেই। আছে কেবল প্রকৃতির বর্ণনা। নবী নেই, বিধানও নেই। লাওৎসে নবী নন। অন্যদিকে মোশি নবী। মোশির পাঁচ পুস্তক অনুসারে পাশ্চাত্যের ঈশ্বর মোশির মিনতিতে হার মেনে নিজের নাম জানান, অলৌকিক কাজ করেন, মোশির সঙ্গে মুখোমুখি কথা বলেন, সিনাই পর্বতে নিজের রূপের একাংশ দেখান, নিজেকে ন্যায়ের ঈশ্বর, ক্রোধের ঈশ্বর, ঈর্ষার ঈশ্বর হিসেবে প্রকাশ করেন, আর নিজের আঙুলে পাথরে দশ আজ্ঞা খোদাই করে মোশির হাতে তুলে দেন। এ সবই মানুষের ঘটনাবলিতে ঈশ্বরের হস্তক্ষেপের চিহ্ন। নবী হয়ে ওঠেন ঈশ্বরের প্রতিনিধি, শেষে গড়ে তোলেন পুরোহিত-শ্রেণি, আর বসেন তার শীর্ষে। গড়ে ওঠে প্রত্যাদিষ্ট ধর্ম। উত্তরসূরিও আসে। মোশির উত্তরসূরি যিহোশূয়, যিনি ঈশ্বরের কাছে সূর্য থামিয়ে দেওয়ার অলৌকিক ঘটনা চেয়ে সফল হন। এভাবে তিনি যুদ্ধে জেতেন আর প্রতিশ্রুত দেশ দখল করেন।
পাশ্চাত্যের ঈশ্বরের ছবি ঘনীভূত হয়ে আছে সেই ঘটনায়, যেখানে মোশি সিনাই পর্বতে দশ আজ্ঞা পান আর ঈশ্বর ও মানুষের মধ্যে চুক্তি হয়। পাশ্চাত্যের ঈশ্বর আর প্রাচ্যের দাওয়ের একটি পার্থক্য হল, মানবসমাজে হস্তক্ষেপের সময় ঈশ্বর অতিপ্রাকৃত “অলৌকিক ঘটনা” ব্যবহার করেন। ঈশ্বর প্রকৃতির স্রষ্টা এক অতিপ্রাকৃত সত্তা। অলৌকিক ঘটনা অতিপ্রাকৃত এবং প্রকৃতিবিরুদ্ধ: তা প্রকৃতির শৃঙ্খলার ঊর্ধ্বের, বা সেই শৃঙ্খলার বিরোধী কাজ।41 মোশি ঈশ্বরের কাছ থেকে ইস্রায়েলের জনগণকে উদ্ধারের দায়িত্ব পেয়েছিলেন। তা পালন করতে তিনি ঈশ্বরের সাহায্য চাইলেন, আর সেই সাহায্য এল অলৌকিক ঘটনার রূপে:
তখন মোশি উত্তর দিলেন, “কিন্তু তারা যদি আমাকে বিশ্বাস না করে, আমার কথা না শোনে, আর বলে, ‘প্রভু তোমার কাছে দেখা দিতেই পারেন না,’ তবে কী হবে?” প্রভু তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার হাতে ওটা কী?” তিনি উত্তর দিলেন, “একটা লাঠি।” তিনি বললেন, “ওটা মাটিতে ফেলো।” মোশি লাঠিটা মাটিতে ফেলতেই তা সাপ হয়ে গেল। (যাত্রাপুস্তক ৪:১-৩)
এভাবে মোশির অনুরোধে ঈশ্বর অলৌকিক কাজ শুরু করেন। নীল নদের জল রক্তে পরিণত করা থেকে শুরু করে মিশরের প্রথমজাত সন্তান আর পশুর প্রথমজাত শাবক মেরে ফেলা পর্যন্ত দশটি আঘাতের অলৌকিক ঘটনার মধ্য দিয়ে ঈশ্বর ফারাওকে রাজি করান, ভয় দেখান, আর ইস্রায়েলের জনগণকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেন। তার পরেও মোশি যখন ইস্রায়েলীয়দের মিশর থেকে দুধ আর মধু প্রবাহিত প্রতিশ্রুত দেশের দিকে নিয়ে যাচ্ছিলেন, ঈশ্বর তাঁর দেখাশোনা করেন; মোশির জন্য লোহিত সাগর দুভাগ করে পথ তৈরির অলৌকিক কাজ করেন, আর মরুপ্রান্তরে খাদ্য হিসেবে মান্না ও ভারুই পাখি ঝরিয়ে দেওয়ার অলৌকিক কাজও করেন।
অন্যদিকে অতিপ্রাকৃত অলৌকিকতা নিয়ে তাও তে চিং-এ একটি কথাও নেই। কারণ তা অতিপ্রাকৃত বা প্রকৃতিবিরুদ্ধ কিছুই মানে না, সবকিছু প্রকৃতির ভেতরেই ব্যাখ্যা করা যায় বলে মনে করে। তার চোখে জগতের সব বস্তুর মধ্যে প্রকৃতির দাও নিহিত, আর জগতে যা কিছু ঘটে সবই প্রাকৃতিক ঘটনা। এ ব্যাপারে দাওবাদ আর কনফুসীয় মতবাদের অবস্থান এক। কথোপকথন-এ বর্ণিত কনফুসিয়াসের কথা ও কাজ দেখায় যে তিনি অলৌকিকে বিশ্বাস করতেন না। কনফুসীয় মতবাদ অলৌকিক ঘটনা, জাদুটোনা, ভেলকি, কুসংস্কারের মতো বিষয়ে আগ্রহ না দেখাতে বলে।
গুরু অদ্ভুত ব্যাপার (怪), বলের কেরামতি (力), বিশৃঙ্খলা (亂) আর দেবতা-অপদেবতা (神) নিয়ে কথা বলতেন না। (কথোপকথন, ৭:২০)
আর এই “অদ্ভুত, বল, বিশৃঙ্খলা ও দেবতা”-সংশ্লিষ্ট মতবাদের চর্চা না করার জন্য তিনি সতর্ক করেন। এই দিকটি জোর দিয়ে বোঝাতে তিনি বলেন, নেতা (জুনজি, 君子; কনফুসিয়াসের কাছে নৈতিকতায় পরিশীলিত, অন্যকে পথ দেখাতে সক্ষম মানুষ, যাঁকে লেখককে অনুসরণ করে এই অনুবাদে “নেতা” বলা হয়েছে) এমন পাত্রের ভূমিকা নেন না, যা অন্যের বেঁধে দেওয়া অদ্ভুত যুক্তি হুবহু মেনে চলে। এ হল অধিবিদ্যাগত যুক্তির বিরুদ্ধে সতর্কবাণী, যা প্রকাশ পেয়েছে “নেতা পাত্র নন” কথাটিতে:
নেতা পাত্র নন (君子不器)। (কথোপকথন, ২:১২)
এই মনোভাব আরও স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন শুনজি (荀子, আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩১০–২৩৫), যুদ্ধরত রাজ্যসমূহের যুগের শেষ দিকের চিন্তক, যিনি কনফুসীয় আর দাওবাদী চিন্তাকে মেলাতে চেষ্টা করেছিলেন। এ দর্শন অলৌকিকে বিশ্বাসী পাশ্চাত্যের সভ্যতার বিপরীত।
আকাশ থেকে তারা খসে পড়ে, বনের গাছ শব্দ করে কাঁদে। মানুষ ভয় পায়। ভয়ে ভাবে, এ কিসের অশনিসংকেত। এ কোনো সংকেত নয়। এ কেবল প্রকৃতির পরিবর্তন, কেবল ইন ও ইয়াংয়ের ক্রিয়া, কেবল কদাচিৎ ঘটা এক ঘটনা। এমন ঘটনাকে অদ্ভুত মনে করা ভালো; কিন্তু ভয় পাওয়া ভুল। (শুনজি, ১৭:৮)
অন্যদিকে পাশ্চাত্যের সভ্যতায় ঈশ্বর প্রাচ্যের দাওয়ের থেকে ভিন্ন, অলৌকিক কাজের এক ধারা রেখে যান। অলৌকিক কাজ করা ঈশ্বর যখন সিনাই পর্বতের কাছে মোশিকে দশ আজ্ঞা দেন, তখন অবশেষে ইস্রায়েলের জনগণ আর ঈশ্বরের মধ্যে কঠোর এক “চুক্তি” স্থাপিত হয়। পাশ্চাত্যের ঈশ্বর অলৌকিক কাজ চালিয়ে গেছেন আর ইস্রায়েলের জনগণের সঙ্গে চুক্তি রক্ষা করে এসেছেন।42 যাত্রাপুস্তক ৩৪:১১-তে তিনি বলেন, “আজ আমি তোমাদের যা আদেশ দিচ্ছি, তা যত্ন করে পালন করো। দেখো, আমি তোমাদের সামনে থেকে ইমোরীয়, কনানীয়, হিত্তীয়, পরিষীয়, হিব্বীয় ও যিবূষীয়দের তাড়িয়ে দেব।” ঈশ্বর মোশির উত্তরসূরি যিহোশূয়কে প্রতিশ্রুত দেশ জয়ের জন্য দরকারি রণকৌশল আর অভিযানের পরিকল্পনাও জানিয়ে দেন, আকাশ থেকে বড় বড় শিলা ফেলে শত্রুসেনাদের মারেন, আর এক দিনের জন্য সূর্যকে থামিয়ে যিহোশূয়কে বিজয়ের দিকে নিয়ে যান।
প্রাচ্যের দাও মানুষের সঙ্গে কোনো চুক্তি করে না। তাই কোনো ব্যক্তি, গোত্র বা রাষ্ট্র দাওকে নিজের বলে দাবি করতে পারে না। প্রাচ্যের দর্শনব্যবস্থা প্রকৃতি-দর্শন দাওকে পরম সত্য বলে বিশ্বাস করে। অন্যদিকে গ্রিক-রোমান যুগে পাশ্চাত্যের সব গোত্র আর রাষ্ট্রের নিজস্ব দেবতা ছিল। ঈশ্বরের প্রতি পাশ্চাত্যের এই বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয় খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতকে প্রত্যাদিষ্ট ধর্ম খ্রিস্টধর্ম রোমের রাষ্ট্রধর্ম হওয়ার পর, আর চলতে থাকে মধ্যযুগের হাজার বছর জুড়ে। আধুনিক যুগে আলোকায়নের সময় পাশ্চাত্যে দেববাদের (理神論) নামে অলৌকিকতা অস্বীকারের আন্দোলন ওঠে, কিন্তু ঈশ্বর মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন, এই বিশ্বাস রয়ে যায়। প্রাচ্যের দাও আর পাশ্চাত্যের ঈশ্বর মানুষের কাছে আসে প্রকৃতি-দর্শন আর প্রত্যাদিষ্ট ধর্মের ব্যবস্থা হিসেবে।
3) মহাবিশ্ব কোথা থেকে এল: অসৎ (無) বনাম সৎ (有)
তাও তে চিং আর মোশির পাঁচ পুস্তক আগে স্থির করে নেয় দাও আর ঈশ্বরের মধ্যে কে আগে, তারপর মহাবিশ্বের উৎস ও নীতি ব্যাখ্যা করে। এখানে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের দর্শনব্যবস্থা যে ধারণা দুটি একযোগে হাজির করে, তা হল অসৎ আর সৎ। মহাবিশ্বের উৎস কী? শূন্য স্থান, অর্থাৎ অসৎ? নাকি পূর্ণ সৎ, অর্থাৎ তারারা? মহাবিশ্বের উৎস কী, এই প্রশ্নে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সভ্যতা মৌলিকভাবে আলাদা। প্রাচ্যের সভ্যতা ব্যাখ্যা করে, সৎ এসেছে অসৎ থেকে, আর সবকিছু শেষে অসতেই ফিরে যায়। প্রাচ্যের ভাষায় এটাই প্রকৃতির নিয়ম। অসৎ আর সৎ পরস্পর যুক্ত, কিন্তু কেন্দ্রে অসৎ।
আকাশের নিচের দশ হাজার বস্তু জন্মায় সৎ থেকে, আর সতের উৎপত্তি অসৎ থেকে। (তাও তে চিং, অধ্যায় ৪০)
অন্যদিকে পাশ্চাত্যের সভ্যতায় মর্মবস্তু হল সৃষ্টির প্রক্রিয়া, যাকে দেখা হয় বিশৃঙ্খলা থেকে সৃষ্টি হিসেবে। সৃষ্ট সৎকে জোর দিয়ে তা ব্যাখ্যা করে যে মহাবিশ্বের উৎস অসৎ, অর্থাৎ অনস্তিত্ব নয়, বরং সৎ, অর্থাৎ অস্তিত্ব। সৎ হল অসৎকে জয় করা অস্তিত্বের সূচনা। অসতের কোনো অর্থ নেই; সমস্ত অর্থ সতের। অতিপ্রাকৃত অলৌকিক কাজ করা ঈশ্বরের ক্রিয়া, অর্থাৎ সৎ, অস্তিত্বের কেন্দ্র। সৎকে দেখানো হয় অসতের অন্ধকারকে সরিয়ে আসা আলো হিসেবে।
ঈশ্বর বললেন, “আলো হোক”, আর আলো হল। (আদিপুস্তক ১:৩)
প্রত্যাদিষ্ট ধর্মের দর্শন খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে গ্রিসে পারমেনিডিসের সেই ভাবনার সঙ্গে মিলে যায়: “কেবল সৎ (有) সত্য, আর অসৎ (無) এক বিভ্রম”। পারমেনিডিস তাঁর কবিতা প্রকৃতি প্রসঙ্গে-তে প্রকৃতির ঘটনা বা পরিবর্তনের নয়, সত্য আর সত্তার দর্শন ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলতেন, কেবল সৎ (অস্তিত্ব) সত্য, আর অসৎ (অনস্তিত্ব) থাকতেই পারে না; অসৎ এমন এক কল্পকথা, যা বলাও যায় না, ভাবাও যায় না। তাঁর দৃঢ় প্রত্যয় ছিল, ইন্দ্রিয় প্রতারণা করে, কেবল মনই সত্যকে চেনে। তিনি বলতেন, সত্তা এক, অপরিবর্তনীয় ও চিরন্তন। তা ছাড়া যা নেই তা আমরা ভাবতে পারি না বলে তিনি কবিতায় বলেছেন, ভাবা আর হওয়া একই। এই বক্তব্যগুলো জানা গেছে প্লেটো, অ্যারিস্টটল প্রমুখ পরবর্তী দার্শনিকদের উদ্ধৃতি থেকে। পাশ্চাত্যের দর্শনব্যবস্থায় অধিবিদ্যার ধারা জাগিয়ে তুলতে এগুলো চূড়ান্ত অবদান রেখেছে।
জগৎকে বোঝার দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ গড়ে উঠেছে এবং হাজার হাজার বছর টিকে আছে। এই দুই পথ মানুষের ঘটনাবলি নিয়ে, জগৎ ও প্রকৃতিকে বোঝার ভঙ্গি নিয়ে, আর চিন্তাকে এগিয়ে নেওয়ার ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে। এই ভিন্ন পথ, পাশ্চাত্যের আর প্রাচ্যের, একে অপরের প্রভাব ছাড়াই আলাদাভাবে জন্মেছে ও বেড়েছে। 43
প্রাচ্যের মহাবিশ্ব-ধারণায় অসৎ কেবল “না থাকা” বোঝায় না; তা সতের বিপরীত এক ধারণা। প্রাচ্যের পরিবর্তনের দর্শন অনুযায়ী অসৎ আর সৎ পরস্পরে রূপান্তরিত হয়ে চলে। অসৎ বোঝায় আরও মৌলিক এক অস্তিত্ব, যা নির্মিত হয়নি, কিংবা জগৎ গড়ে ওঠার আগের আদি অবস্থা। এর তুলনায় সৎ বোঝায় সেই জগৎ, যাকে আমরা প্রতিদিন অভিজ্ঞতায় পাই: বস্তুর পরিবর্তনশীল অবস্থা, জন্ম আর বিলয়ের জগৎ। তাই দাওবাদে উজি (無極) বা অসৎ নিছক “নেই” বোঝায় না। তা বোঝায় সতের আগের এমন এক গভীরতর, মৌলিকতর অস্তিত্ব বা অবস্থা, যাকে আমাদের দৈনন্দিন ইন্দ্রিয় দিয়ে ধরা কঠিন।
যার নাম দেওয়া যায় না, তা আকাশ ও পৃথিবীর উৎস; যার নাম দেওয়া যায়, তা দশ হাজার বস্তুর জননী… এই দুই আসলে একই, কিন্তু প্রকাশিত হয়ে ভিন্ন ভিন্ন নাম পায়।
(তাও তে চিং, অধ্যায় ১)
পাশ্চাত্যে কাঠখোদাই ছবির একটি সংকলন প্রকাশিত হয়েছিল, যেখানে মহাবিশ্ব সৃষ্টির সূচনা, জগতের প্রথম দিন প্রভৃতি বাইবেলের প্রধান ঘটনাগুলো ছবি আর ভাষ্যে উপস্থাপিত। জার্মানির ন্যুরেমবার্গে তৈরি বলে একে বলা হয় ন্যুরেমবার্গ ক্রনিকল (Nuremberg Chronicle); এর প্রথম সংস্করণ বেরোয় ১৪৯৩ সালে। সংকলনটি শুরুই হয়েছে সৃষ্টির প্রথম দিনের একটি খোদাইচিত্র দিয়ে। পাশ্চাত্যের সভ্যতার জন্য তা তুলে ধরে বিশৃঙ্খল অসৎ থেকে সৃষ্ট সতের অস্তিত্ব। তা ঘোষণা করে কেঅস (বিশৃঙ্খলা) থেকে ইউনিভার্সে (শৃঙ্খলা) যাত্রা, অর্থাৎ সৃষ্টির সূচনা। সতের সৃষ্টিতে অসৎ, অর্থাৎ অনস্তিত্ব, মুছে যায়। সৃষ্টির ফলে যা কিছু বিদ্যমান, সবই দাঁড়ায় “অপরিবর্তনীয় সত্তার দর্শনের” ওপর।
ন্যুরেমবার্গ ক্রনিকল প্রকাশের প্রায় একই সময়ে, পঞ্চদশ শতক থেকে, দাওবাদ প্রাচ্যের মহাবিশ্ব-ধারণা ধারণকারী তাইজি-চিত্র ব্যবহার করতে শুরু করে। তাইজি-চিত্র অসৎ-বোধক উজি থেকে শুরু হয়ে তাইজিতে (太極) পৌঁছায়। তাইজি দুই ভাগে বিভক্ত, যা বোঝায় ইন ও ইয়াং। 44 তাইজি-চিত্রের নকশা পঞ্চদশ শতকে চালু হলেও তাতে ধরা ইন ও ইয়াংয়ের ধারণা দুহাজার বছর আগের তাও তে চিং-এও স্পষ্টভাবে বর্ণিত: “সব বস্তু ইনকে পিঠে বয়, ইয়াংকে বুকে জড়ায়” (তাও তে চিং, অধ্যায় ৪২)। এই মহাবিশ্ব-ধারণা এমন এক মহাবিশ্বের নীতি ঘোষণা করে, যেখানে সব বস্তু “ইন ও ইয়াং দিয়ে গঠিত পরিবর্তনের দর্শনের” মধ্যে সামঞ্জস্য রক্ষা করে।
4) মহাবিশ্ব কীভাবে চলে: পরিবর্তনের দর্শন (變化論) বনাম সত্তার দর্শন (存在論)
প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য “মহাবিশ্বের উৎস”, অর্থাৎ মহাবিশ্বের মূলকে বিপরীতভাবে স্থাপন করে। প্রাচ্য জগৎকে বুঝেছে অবিরাম পরিবর্তন আর সম্পর্কের মধ্য দিয়ে; পাশ্চাত্য জগৎকে ধরেছে সত্তার সারবস্তু আর কাঠামোর মধ্য দিয়ে। অর্থাৎ প্রাচ্য মন দিয়েছে “সবকিছু বদলায়”-এ, পাশ্চাত্য মনোযোগ দিয়েছে “কী বিদ্যমান”-এ। এই চিন্তাধারার মূলে রয়েছে মহাবিশ্ব কোথা থেকে এল, মহাবিশ্বের উৎস নিয়ে এই প্রশ্নে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের পার্থক্য। প্রাচ্যের অসৎ (無) আর পাশ্চাত্যের সৎ (有): দুই পক্ষের দেখা মহাবিশ্বের উৎসের পার্থক্য এটাই। “মহাবিশ্বের উৎসের” এই পার্থক্য থেকে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য ভিন্ন ভিন্ন “মহাবিশ্বের নীতি” স্থির করে: প্রাচ্যের পরিবর্তনের দর্শন আর পাশ্চাত্যের সত্তার দর্শন।
প্রাচ্যে বস্তু যেহেতু অসৎ থেকে সতে বদলে যায়, তাই অসৎ আর সৎ দুটিরই মূল্য আছে। অসৎ আর সতের পরিবর্তনের দর্শনই এর মর্মবস্তু। কিন্তু পাশ্চাত্য তার দার্শনিক চিন্তার মর্মে বসায় এমন এক সত্তার দর্শন, যা সমস্ত মূল্য দেয় সৎকে, অর্থাৎ অস্তিত্বকে। এ হল “অসৎকেন্দ্রিক পরিবর্তনের দর্শন” আর “সৎকেন্দ্রিক সত্তার দর্শনের” পার্থক্য। প্রাচ্য অস্তিত্বকে ধরে প্রবাহ আর সম্পর্কের মধ্যে পরিবর্তন হিসেবে। পাশ্চাত্য অস্তিত্বকে দেখে স্থির বস্তুসত্তা আর সারবস্তু হিসেবে।
পাশ্চাত্য দর্শন শুরু হয় বস্তুসত্তা নিয়ে এক প্রশ্ন থেকে, “সত্তা কী?”, আর কাজকে বোঝা হয় সত্তার সারবস্তু প্রকাশের উপায় হিসেবে। জোর পড়ে ব্যক্তির ওপর: মানুষ এক স্বাধীন কর্তা, যে নিজের পছন্দ আর স্বাধীনতা দিয়ে নিজের কাজ নির্ধারণ করে। ফলে যুক্তিসংগততা মূল্য পায়, কাজকে বিচার করা হয় যৌক্তিক ও নৈতিক মানদণ্ডে, আর সত্তার অর্থ সন্ধানের প্রক্রিয়ায় গড়ে ওঠে নিয়মনীতি। প্রাচ্যের পরিবর্তনের দর্শন মহাবিশ্ব-সংক্রান্ত এমন এক দার্শনিক চিন্তা, যা পাশ্চাত্যের সত্তার দর্শনের বিপরীত। পাশ্চাত্য দর্শনের মর্মে আছে সত্তার দর্শন, অর্থাৎ ঈশ্বরের আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি থেকে শুরু হওয়া অস্তিত্ব। সত্তার দর্শন অপরিবর্তনীয় মানবস্বভাবের ওপর দাঁড়ানো বিধানের গুরুত্বের ওপর জোর দেয়। ইহুদি ধর্মের বিধান হল ইহুদি নবীদের ঈশ্বরের কাছ থেকে পাওয়া প্রত্যাদেশ, “ঈশ্বরের বাক্য” (Word of God)। গুরুত্বপূর্ণ হল, ঈশ্বর “চূড়ান্ত সত্তা” (Ultimate Being) হিসেবে সৃষ্ট অস্তিত্বের প্রকাশ: সৎ (有) সবকিছুর সূচনা। পাশ্চাত্যের মানবজীবনে কর্মের চিন্তার ওপর দাঁড়ানো, বিধানকে মূল্য দেওয়া ঐতিহ্য ও দর্শন হুবহু আধুনিক সমাজ পর্যন্ত চলে এসেছে। তা অস্তিত্বকে “স্থির বস্তুসত্তা” হিসেবে ধরেছে, আর গড়িয়ে গেছে সত্তার সারবস্তু ও কাঠামো অনুসন্ধানী অধিবিদ্যার দিকে। প্রাচ্য জোর দিতে থাকে গতিশীল ও সমন্বিত বিশ্ববীক্ষায়, পাশ্চাত্য স্থির ও বিশ্লেষণী বিশ্ববীক্ষায়।
পাশ্চাত্যের সভ্যতা বিকশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ঐতিহ্য ও দর্শন এমন রূপ নেয়, যা পাশ্চাত্যের আইন, প্রতিষ্ঠান আর মডেলকে মূল্য দেয়। আবারও বলি, এই দর্শন দাঁড়িয়ে আছে সত্তার এমন এক দর্শনের ওপর, যা বলে, যা সৃষ্ট তা চিরকাল বিদ্যমান। তাই পাশ্চাত্য নিজের প্রতিষ্ঠান আর মডেলকে চিরন্তন সত্তার দর্শনে প্রতিষ্ঠিত বলে মনে করে সেগুলোকে বিপুল গুরুত্ব দেয়; আর এই প্রতিষ্ঠান ও মডেল যেহেতু সমগ্রের সঙ্গে যুক্ত, তাই সেগুলোকে মূল্য দিয়ে পাশ্চাত্য সেগুলোকেই করে তোলে নিজের সভ্যতা ছড়িয়ে দেওয়ার উপায়।
পরিবর্তনের দর্শন প্রাচ্যের সভ্যতা বোঝার মূল চাবিকাঠি; কিন্তু সত্তার অধিবিদ্যায় ডুবে থাকা পাশ্চাত্যের পক্ষে এ ধারণা বোঝা কঠিন। ইংরেজিতে পরিবর্তনের দর্শনকে বলা হয় transformationism, আর সত্তার দর্শনকে ontology। 45 প্রাচ্যের সভ্যতা মহাবিশ্বের পরিবর্তনকে বুঝে এসেছে ই (易)-এর দৃষ্টিকোণ থেকে। 易 অক্ষরের অর্থ “পরিবর্তন”। এর উৎস এক চিত্রলিপি, যা টিকটিকির গায়ের রঙের বদল, বা সূর্য আর চাঁদের চক্রাকার পরিবর্তনের প্রতীক। পরিবর্তনের দর্শনের ধারণা খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দ থেকে প্রাচ্যে ব্যাপকভাবে গৃহীত। পরিবর্তনের দর্শন ধারণকারী ই চিং (易經, পরিবর্তনের গ্রন্থ) চীনের প্রাচীনতম দার্শনিক ধ্রুপদি গ্রন্থ; খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দের কাছাকাছি এর সূচনা, আর এটিই দাওবাদী ও কনফুসীয় দর্শনে পরিবর্তনের দর্শন রোপণ করেছে।46
পরিবর্তন বাস্তবের এক মৌলিক গুণ। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের কোয়ান্টাম বলবিদ্যা যে পরিবর্তনের দর্শনের কথা বলে, তা এই গুণের অংশীদার। এটি ধ্রুপদি পদার্থবিজ্ঞানের সত্তার দর্শনের বিপরীত, যেখানে স্বাধীন বস্তুসত্তা বিদ্যমান। প্রাচ্য মহাবিশ্বের যে নীতি দেখেছে, তা অসৎ আর সতের মধ্যে আসা-যাওয়া করা পরিবর্তনের দর্শন। প্রাচ্যের চিন্তা শুরু হয় অপরিবর্তনীয় সত্তা থেকে নয়, এমন এক পরিবর্তনের দর্শন থেকে, যেখানে সবকিছু অবিরাম বদলায়। পরিবর্তনের দর্শন অস্তিত্বকে স্থির বস্তুসত্তা হিসেবে নয়, সম্পর্ক আর প্রক্রিয়া হিসেবে বুঝতে চায়। পরিবর্তনের দর্শনের দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করলে “বিদ্যমান থাকা” মানেই “বদলানো”।
পাশ্চাত্যের বিশ্বতত্ত্বে অসৎ বিদ্যমান নয়, তাই তা হয়ে ওঠে “সতের বিশ্বতত্ত্ব”। কেবল সতের অস্তিত্বে মনোযোগ দেওয়ায় দার্শনিকভাবে একে সত্তার দর্শন বলা হয়। পারমেনিডিস বলতেন, “সত্তা অজাত ও অবিনাশী, পূর্ণ, অপরিবর্তনীয় ও সম্পূর্ণ। তা অতীতে ছিল, এখন আছে, ভবিষ্যতেও সব সময় একই রকম থাকবে।” তিনি বলতেন, “অ-সত্তাকে বলা যায় না, ভাবা যায় না, তা বিদ্যমানও নয়। ভাবা যায় কেবল যা বিদ্যমান তাকেই।” এই সত্তার দর্শনই হয়ে ওঠে প্লেটো ও অ্যারিস্টটলের ব্যক্ততার তত্ত্ব আর অধিবিদ্যার ভিত্তি। “সত্তা সৃষ্টি করা” পাশ্চাত্যের বিশ্বতত্ত্বের মর্ম সতে। কেঅসের বিশৃঙ্খলা থেকে সৃষ্ট সৎ সত্তার দর্শনের জোরে তার অপরিবর্তনীয় গুণ অটুট রেখে টিকে থাকে। 47
দার্শনিক চিন্তা ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে মিলে যাওয়ায় পাশ্চাত্যের সত্তার দর্শন আরও শক্তিশালী হয়। প্রত্যাদিষ্ট ধর্মের চিন্তায় ভিত্তি হল এই সত্তার দর্শন যে ঈশ্বর যা সৃষ্টি করেছেন তা বদলানো চলে না। পরিবর্তন স্বীকার করার সময়ও পাশ্চাত্য পরিবর্তনের ভেতরের অপরিবর্তনীয় উপাদানকে গুরুত্ব দেয়, আর তাকে সত্তার দর্শনের গণ্ডির মধ্যেই রাখে। প্লেটোর দর্শনের বক্তব্য, বাস্তবের পরিবর্তনের পেছনে আছে অপরিবর্তনীয় সারসত্তা আইডিয়া; এটাই তার দৃষ্টান্ত। এ এমন এক সত্তার দর্শন, যেখানে পরিবর্তন আনুষঙ্গিক ঘটনা আর সারসত্তা অপরিবর্তনীয়। সপ্তদশ শতকে দেকার্ত এই চিন্তার উত্তরাধিকার নেন। তাঁরা অপরিবর্তনীয় বস্তুসত্তা, অর্থাৎ জড় বা মনকে অস্তিত্বের ভিত্তি ধরে দর্শনব্যবস্থা গড়ে তোলেন। পাশ্চাত্যে সত্তার দর্শন আর তার ওপর দাঁড়ানো অধিবিদ্যা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে দেকার্তকে বলা হয় আধুনিক দর্শনের জনক।
প্রাচ্যের পরিবর্তনের দর্শনের দৃষ্টিভঙ্গি প্রাচ্যের দর্শনব্যবস্থায় হুবহু প্রতিফলিত। প্রাচ্যের কোনো ধ্রুপদি গ্রন্থেই স্রষ্টা বা সৃষ্টির ধারণা নেই। মহাবিশ্ব আর প্রকৃতির সবকিছু সৃষ্টির মতো কোনো কাজের ফল নয়, তা আগে থেকেই ছিল, আর অবিরাম বদলে বদলে আমাদের দেখা ঘটনাগুলো তৈরি করে। বিশাল মহাবিশ্বের দিকে তাকালেও দেখা যায়, সবকিছু সব সময় চলছে, বদলাচ্ছে। কিছুই কখনো থামে না। পরিবর্তনের কোনো উদ্দেশ্য নেই, তার মর্মও ধরা যায় না। তাই পরিবর্তনের দর্শনের এই স্থিরতাই এক অর্থে সব পরিবর্তনকে সম্ভব করার ভিত্তি। এই দর্শন থেকে, অর্থাৎ মহাবিশ্বের পরিবর্তন থেকে, জন্ম নেয় পরিবর্তনের ধারা অনুসরণকারী দাওয়ের ধারণা।
প্রাচ্যের পরিবর্তনের দর্শন যা নেই (অসৎ) আর যা আছে (সৎ), এই দুইয়ের সম্পর্কের মধ্য দিয়ে মহাবিশ্বকে বুঝতে চায়। অসৎ নিছক অনুপস্থিতি নয়; তা সেই উৎস, যা সৎকে সম্ভব করে। অসৎ সৃষ্টির সম্ভাবনা, আর সৎ তার বাস্তবায়ন। মহাবিশ্বের উৎস অসৎ, আর অসৎ শূন্যতা নয়, সম্ভাবনা আর সম্ভাব্যতার উৎস। মহাবিশ্বের প্রবাহ হল অসৎ আর সতের গতি; জন্ম আর বিলয়, উত্থান আর পতন, ইন ও ইয়াংয়ের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে মহাবিশ্ব অবিরাম অসৎ আর সতের মধ্যে আবর্তিত হয়। পরিবর্তনের দর্শনের অর্থ, সত্তা নয়, “পরিবর্তন নিজেই মহাবিশ্বের নীতি”। অর্থাৎ জোর “বিদ্যমান বস্তুর পরিবর্তনে” নয়, “পরিবর্তন নিজেই”-তে; বস্তুর ওপর কোনো জোর নেই। কারণ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বস্তুও বদলে যায়।
অন্যদিকে সত্তার দর্শনের কেন্দ্রে বিদ্যমান বস্তু। পরিবর্তন নির্বিশেষে তা নিজের অস্তিত্বের মূল্য অটুট রাখে। এখান থেকেই অধিবিদ্যা, অর্থাৎ সত্তাতত্ত্ব (ontology), উদ্দেশ্যবাদ (teleology) আর সেগুলোকে জানার জ্ঞানতত্ত্ব (epistemology), পাশ্চাত্য দর্শনের মর্মবস্তু হয়ে ওঠে। পাশ্চাত্যের দর্শনব্যবস্থায় সত্তার বিপরীত হল অনস্তিত্ব। এমন পাশ্চাত্যকেন্দ্রিক চিন্তা দিয়ে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের তুলনা অসম্ভব। এই তুলনায় সত্তার দর্শনকে তুলনা করা যায় অনস্তিত্বের সঙ্গে নয়, পরিবর্তনের দর্শনের সঙ্গে; অর্থাৎ সতের প্রতিপক্ষ অসৎ নয়, “অসৎ আর সতের মধ্যকার পরিবর্তন”। শেষ পর্যন্ত পরিবর্তনের দর্শন আর সত্তার দর্শন দুই সভ্যতার চিন্তাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন দুই দর্শনব্যবস্থার ওপর দাঁড় করায়। ঈশ্বর যা সৃষ্টি করেছেন, তার উদ্দেশ্য থাকতেই হবে। সত্তাতত্ত্ব, উদ্দেশ্যবাদ, জ্ঞানতত্ত্বের মতো অধিবিদ্যা-ঘেঁষা দর্শনব্যবস্থা পরিবর্তনের দর্শনকে মর্মবস্তু মানা প্রাচ্যের চিন্তায় বিকশিত হতে পারেনি, আর প্রাচ্যের দর্শনে এগুলো গুরুত্বহীন ধারণা।48
পরিবর্তনের দর্শন অনুসারে মহাবিশ্ব সত্তার দর্শনের কল্পিত স্থির বস্তুসত্তা নয়, পরিবর্তনের এক প্রক্রিয়া। মহাবিশ্ব বা প্রকৃতি সত্তার দর্শনের কল্পিত কোনো উদ্দেশ্য বা উপকরণ নয়; পরিবর্তনের দর্শন অনুযায়ী তা চিরকাল বদলে চলা, নিজে থেকেই বিদ্যমান সত্তা। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের কোয়ান্টাম বলবিদ্যায় শূন্যতার অসৎ হয়ে ওঠে সম্ভাবনার এক স্থান, যা শূন্য নয়। ধ্রুপদি পদার্থবিজ্ঞানে শূন্যতার কোনো অর্থ নেই: তা কেবল এক ফাঁকা স্থান, যেখানে পরম জড় আর শক্তি সক্রিয়। তাই পাশ্চাত্যের সত্তার দর্শনে মানুষের প্রকৃত প্রজ্ঞা হল কর্ম (ইয়ু ওয়েই, 有爲), যা সৎ থেকে উদ্ভূত সৃষ্টিকে অনুসরণ করে। কিন্তু প্রাচ্যে মানুষের প্রকৃত প্রজ্ঞা হল অকর্ম (উ ওয়েই, 無爲), যা পরিবর্তনশীল সৎকে নয়, “সতের উৎস অসৎ”-কে অনুসরণ করে।
পাশ্চাত্যে পরিবর্তনের দর্শন প্রকাশ করেছিলেন গ্রিসের হেরাক্লিটাস। “মানুষ একই নদীতে দুবার পা ডোবাতে পারে না”, পরিবর্তন নিয়ে তাঁর রেখে যাওয়া বিখ্যাত উক্তি। কিন্তু সক্রেটিসের পর পাশ্চাত্যের ব্যক্ততার তত্ত্ব যে পারমেনিডিসের দর্শন অনুসরণ করেছিল, তার চাপে তাঁর পরিবর্তনের দর্শন হারিয়ে যায়। পাশ্চাত্যে বিংশ শতকে এসে হোয়াইটহেডের মতো দার্শনিক পরিবর্তনের দর্শনের পক্ষে দাঁড়ান।49 তিনি বলেছিলেন, মহাবিশ্ব অবিরাম সৃষ্টি ও গঠনের প্রক্রিয়ার সমষ্টি, ঘটনার এক ধারা, কোনো স্থির বস্তুসত্তা নেই। পরিবর্তনের দর্শনের কেন্দ্রে আছে বাস্তবের সারকথা গতিশীলতা: জন্ম, বিলয়, পারস্পরিক ক্রিয়া। তাই বস্তুর সংজ্ঞা দেওয়া হয় স্বাধীন বস্তুসত্তা হিসেবে নয়, “প্রক্রিয়া” বা “সম্পর্কের” মধ্যে।
প্রাচ্যের দর্শন সৎ আর অসৎ, এই দুই মৌলিক নীতিকে স্বাধীনভাবে বিদ্যমান হিসেবে নয়, পরস্পরের পরিপূরক এবং পরিবর্তনশীল হিসেবে ব্যাখ্যা করে। তাই অপরিবর্তনীয় সত্তার দর্শন নিয়ে আগ্রহ বা অনুমান প্রাচ্যের সভ্যতায় বিকশিত হয়নি। প্রাচ্যের দর্শনের ইতিহাসে পাশ্চাত্যের সত্তাতত্ত্ব বা জ্ঞানতত্ত্ব কেন বিকশিত হয়নি, প্রাচ্যের পরিবর্তনের দর্শন দিয়ে তা ব্যাখ্যা করা যায়। বরং প্রাচ্যে বিকশিত হয় শি (勢), অর্থাৎ অবস্থানের শক্তির দর্শন, যা পরিবর্তনের ভেতরে লুকোনো ধারা চিনে নিয়ে কাজে লাগায়; সেই সঙ্গে মানবস্বভাবের ওপর দাঁড়ানো শু (術), অর্থাৎ রাজনীতির কৌশলের দর্শন, আর বিধানের চেয়ে নৈতিকতাকে (倫理) বেশি গুরুত্ব দেওয়া নৈতিকতার দৃষ্টিভঙ্গি। প্রাচ্যের সভ্যতার কেন্দ্রে দাঁড়ায় শি (勢), শু (術) আর নৈতিকতাকে আগে রাখা আইনের (法) দর্শনব্যবস্থা, এবং তার ওপর দাঁড়ানো বাস্তব রাজনৈতিক নৈতিকতা ও রাজনৈতিক অর্থনীতির দর্শন। নৈতিকতাকে আগে রাখা আইন, শি আর শুয়ের এই দর্শনব্যবস্থা সত্তার দর্শনের ওপর দাঁড়ানো পাশ্চাত্যের চিন্তায় বিকশিত হতে পারত না।
খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দের কাছাকাছি পর্যন্ত প্রাচ্যের সভ্যতাও পাশ্চাত্যের মতো গাংরৌ (剛柔, কঠিন ও কোমল) ধারণা ব্যবহার করত, আর কাঠিন্যের মূল্যকে কোমলতার চেয়ে বড় করে দেখত। কিন্তু খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দের কাছাকাছি সময়ের পর কাঠিন্যের চেয়ে কোমলতাকে বেশি মূল্য দেওয়ার প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই সময়টিই সেই মোড়, যখন কঠিন-কোমলের তত্ত্বকে সরিয়ে ইন ও ইয়াংয়ের তত্ত্ব প্রাচ্যের সভ্যতার প্রধান চিন্তা হয়ে ওঠে।50 এর প্রমাণ মেলে ই চিং-এ: খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দের কাছাকাছি পর্যন্ত তাতে কঠিন-কোমলের তত্ত্ব ব্যবহৃত হত, সেই সময় পেরিয়ে ইন ও ইয়াংয়ের তত্ত্ব তার জায়গা নেয়। চিন্তার এই পরিবর্তন প্রকাশ পায় প্রাচ্যের দর্শনের প্রতিনিধি দাওবাদ আর কনফুসীয় মতবাদের মূল মূল্যবোধে। দাওবাদ আর কনফুসীয় মতবাদ সামনে আনে নম্রতা, কোমলতা, সংযম আর আত্মচর্চা।
প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সভ্যতার তুলনা করলে একটি কৌতূহলজাগানো তথ্য চোখে পড়ে। লক্ষ করা দরকার, প্রাচ্যের সভ্যতায় কঠিন-কোমলের তত্ত্বের জায়গায় ইন ও ইয়াংয়ের তত্ত্ব আসার সময় আর পাশ্চাত্যের সভ্যতায় বহুদেববাদের জায়গায় একেশ্বরবাদ আসার সময় প্রায় একই। বহুদেববাদ যখন পাশ্চাত্য আর মধ্যপ্রাচ্যের বেশির ভাগ অঞ্চল ছেয়ে ফেলেছিল, তখন মিশর, পারস্য আর যিহূদায় একেশ্বরবাদের আবির্ভাব ঘটে। এই সময়কে মোটামুটি খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দের আশপাশে ধরা যায়। এই সময়ের পর প্রাচ্যে কঠিন-কোমলের তত্ত্বের বদলে ইন ও ইয়াংয়ের তত্ত্ব, আর পাশ্চাত্যে বহুদেববাদের বদলে একেশ্বরবাদ ছড়িয়ে পড়ার দিকে ঘটনাপ্রবাহ এগোয়।
ই চিং (易經) বনাম দৈববাণী (神託): দাওবাদ আর কনফুসীয় মতবাদের মধ্য দিয়ে ই চিং প্রাচ্যের চিন্তায় বেঁচে আছে
হাজার হাজার বছর ধরে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের ইতিহাসে চূড়ান্ত মুহূর্তগুলোতে ই চিং আর দৈববাণী ভবিষ্যৎ আঁচ করার কাজ করেছে। ই চিং আর দৈববাণী কীভাবে ব্যবহার করতে হবে, সেই পদ্ধতিতেই ধরা পড়ে প্রাচ্যের পরিবর্তনের দর্শন আর পাশ্চাত্যের সত্তার দর্শনের পার্থক্য। দৈববাণী বোঝাতে যে শব্দ 神託, তার অর্থ, দেবতা (神) মানুষের দেহ ধার করে (託) মানুষের প্রশ্নের উত্তর দেন। ঈশ্বর আর মানুষের মাঝে আবির্ভূত হয় এক মধ্যস্থ। মন্দিরে বাস করে দৈববাণী শোনানো পুরোহিতনী প্রত্যাদিষ্ট ধর্মের নবীর মতো ভূমিকা পালন করতেন। লোকোত্তর সত্তা ঈশ্বর ভবিষ্যৎ স্থির করে রেখেছেন, তাই মধ্যস্থের মাধ্যমে তা আগেভাগে জেনে নেওয়াই উদ্দেশ্য। ঈশ্বরের সিদ্ধান্তের মধ্যে প্রবল প্ররোচনার শক্তি আছে: মানুষকে তা মানতেই হবে। তাই পরম ঈশ্বরের কাছে শক্তি প্রার্থনার মনস্তত্ত্ব মানবস্বভাবেই নিহিত।
কিন্তু মানুষ যখন অলৌকিকে আর মানুষের ঘটনাবলিতে ঈশ্বরের সরাসরি হস্তক্ষেপের যুক্তিতে বিশ্বাস করত, দৈববাণীর সেই যুগ বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে ইতিহাসে মিলিয়ে গেছে। পাশ্চাত্যের আলোকায়ন, দেববাদ আর যুক্তিবাদ থেকে উদ্ভূত চিন্তাব্যবস্থা পাশ্চাত্যের দৈববাণীকে গ্রিক-রোমান যুগের ধ্বংসাবশেষে পরিণত করেছে। কিন্তু প্রাচ্যের ই চিং, অন্তত তার পরিবর্তনের দর্শন, প্রাচ্যের চিন্তার মর্মে আজও হুবহু কার্যকর হয়ে আছে। কারণ প্রাচ্যের সভ্যতার বৈশিষ্ট্য সমন্বয়বাদ (syncretism) অনুসারে ই চিং-এর পরিবর্তনের দর্শন দাওবাদ আর কনফুসীয় মতবাদের দর্শনব্যবস্থায় হুবহু প্রতিফলিত। দাওবাদের অকর্মের চিন্তা আর কনফুসীয় মতবাদের নেতার চিন্তা ই চিং-এর পরিবর্তনের দর্শনের সঙ্গে যুক্ত।
প্রাচ্যের ই চিং-এর চিন্তা দাঁড়িয়ে আছে পরিবর্তনের দর্শনের ওপর: মানুষের ভবিষ্যৎ আগে থেকে স্থির নয়, তা বয়ে চলে প্রকৃতি আর মানুষের পারস্পরিক ক্রিয়ায়। গুরুত্বপূর্ণ হল, মানুষ এই ধারা চিনে নিয়ে ভবিষ্যতের ধারায় প্রভাব ফেলবে। পাশ্চাত্যের দৈববাণী, অর্থাৎ ওরাকল, চলে নিয়তিবাদ অনুযায়ী; কিন্তু ই চিং-এর বাছাই কাজ করে মানুষের পছন্দকে অন্তর্ভুক্ত করা পরিবর্তনের দর্শনের কাঠামোয়:
মানুষের প্রতিটি পরিস্থিতি নির্ভর করে মানুষ ভালো কাজ করছে, নাকি মন্দ কাজ, তার ওপর। মানুষকে ভালো কাজ বেছে নিতে সাহায্য করাই ই চিং-এর ভূমিকা। তাই ভবিষ্যৎ বলে দেওয়ার গণনা থেকে ই চিং সম্পূর্ণ ভিন্ন স্তরের জিনিস 51
ই চিং কেবল ভবিষ্যৎ বলে দিয়ে স্বর্গের সিদ্ধান্তকে পূর্বনির্ধারিত নিয়তি হিসেবে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া গণনার বইয়ের চরিত্রকে ছাড়িয়ে যায়।52 ই চিং মানুষকে যা দেয়, তা কেবল “ভবিষ্যৎ এমন হবে” গোছের পূর্বনির্ধারিত সূচি নয়, বরং বাছাইয়ের অবকাশ: “আমার কী করা উচিত?” তাই পাশ্চাত্যের দৈববাণীর বিপরীতে প্রাচ্যের ই চিং-এ মানুষের ভূমিকাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ই চিং-এর ত্রিরেখ চিহ্নের (卦) তিনটি রেখা বসায় স্বর্গ, পৃথিবী, আর তাদের মাঝখানে মানুষের ভূমিকা। স্বর্গের সময় আর পৃথিবীর অবস্থান ভালো করে লক্ষ করতে হবে, কিন্তু তার মধ্যেই মানুষকে খুঁজে নিতে হবে নিজের পক্ষে সবচেয়ে উপযুক্ত ভূমিকা, আর তা পালন করে নিজের নিয়তি নিজেই নির্ধারণ করতে ও গড়ে নিতে হবে।
ই চিং অনুসারে প্রতিটি পরিস্থিতির জন্য মানুষের সামনে একটি করে উপযুক্ত কাজ থাকে। প্রতিটি পরিস্থিতিতে সঠিক কাজ আর বেঠিক কাজ, দুটিই বাছাইয়ের সম্ভাবনা হিসেবে বিদ্যমান। ই চিং নিছক ভবিষ্যদ্বাণী বা গণনার বই নয়, প্রজ্ঞা আর নৈতিকতা ধারণকারী এক দর্শনগ্রন্থ। “গণনা না করাও চলবে না, গণনায় পুরো বিশ্বাস করাও চলবে না। কিন্তু গণনার পরামর্শ অবশ্যই নিয়ো” (উত্তর অভিযানের সেনাপতিকে রাজা সেজোং-এর ফরমান, জোসন রাজবংশের বৃত্তান্ত থেকে)। সঠিক কাজ আনে সৌভাগ্য, আর বেঠিক কাজ আনে দুর্ভাগ্য।
তাহলে প্রতিটি পরিস্থিতির উপযোগী সঠিক কাজ কী? তা খুঁজে বের করাই প্রদত্ত পরিস্থিতিতে মানুষের সিদ্ধান্তের বিষয়। ই চিং জোর দিয়ে বলে, নিত্য পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির শুরুতে মানুষ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কাজ করলে ভবিষ্যতে তার প্রভাব তত বেশি হতে পারে। ই চিং-এর নৈতিক দিকটি প্রবল, আর তার উদ্দেশ্য পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে পথ কেটে এগোনোর প্রজ্ঞা হিসেবে কাজে লাগা।
অনেকে ই চিং-কে অস্পষ্টভাবে গণনার বই, কিংবা প্রাচ্যের রহস্যময় প্রাচীন শাস্ত্রগুলোর একটি বলে মনে করেন।53 কিন্তু প্রাচ্যের সংস্কৃতিতে ই চিং-এর গুরুত্ব এতটাই যে তা প্রাচ্যের মহাবিশ্ব-ধারণা আর প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক নির্ধারণ করে।
প্রাচ্যের সংস্কৃতিতে দাওবাদ, কনফুসীয় মতবাদ প্রভৃতির সঙ্গে কয়েকশো বছরের পারস্পরিক ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ই চিং তার দর্শনকে প্রাচ্যের চিন্তার ভিত্তিতে বিছিয়ে দিয়েছে। বসন্ত ও শরৎ এবং যুদ্ধরত রাজ্যসমূহের যুগে ই চিং-এর ভাষ্যগুলো গড়ে ওঠা ও সম্পূর্ণ হওয়ার প্রক্রিয়ায় ই চিং, দাওবাদ আর কনফুসীয় মতবাদের মধ্যে চিন্তার আদানপ্রদানের এক গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়। ঝৌ ই অধ্যয়ন ও ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দাওবাদী আর কনফুসীয় পণ্ডিতেরা তার অন্তর্নিহিত দর্শন আর অভিমুখ নিজেদের চিন্তায় আত্মস্থ করেন ও বিকশিত করেন। এই আদানপ্রদানের মধ্য দিয়ে ঝৌ ই দাওবাদ আর কনফুসীয় মতবাদের মাধ্যমে পুরোনো ই চিং-এর চিন্তাব্যবস্থাকে বিকশিত করে, আর তার ভাষ্যগুলোর মাধ্যমে দাওবাদ ও কনফুসীয় মতবাদের প্রভাবপুষ্ট প্রকৃতি-ভাবনা, নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, রাজনৈতিক দর্শন প্রভৃতি চিন্তাকে নিজের মধ্যে যুক্ত করে নেয়। দাওবাদ আর কনফুসীয় মতবাদের ওপর ই চিং-এর গভীর প্রভাবের কারণে দাওবাদী-কনফুসীয় সাংস্কৃতিক বলয়ের দেশগুলোতে তার প্রভাব আজও জীবন্ত।
ই চিং যে পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বইগুলোর একটি, তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই… চীনের তিন হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ইতিহাস ধারণকারী এ এক সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ ও অর্থবহ বই। চীনের গোটা সাংস্কৃতিক ইতিহাস হয় এই বই থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছে, নয়তো এর ব্যাখ্যায় প্রভাব ফেলেছে। তাই ই চিং-এ ধরা আছে হাজার হাজার বছর ধরে ঘষেমেজে শাণিত প্রজ্ঞা। চীনা দর্শনের কেন্দ্রে থাকা কনফুসীয় মতবাদ আর দাওবাদ দুটিই যে ই চিং-এর দর্শনের ওপর দাঁড়িয়ে, তা স্বাভাবিক। 54
এই দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হল, ই চিং-এর অন্তর্নিহিত প্রকৃতিবাদী মহাবিশ্ব-ধারণা আর পরিবর্তনের দর্শন দাওবাদী ও কনফুসীয় চিন্তার অন্তর্নিহিত নৈতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দর্শনের সঙ্গে মিলে এক হয়ে যায়। এর অর্থ, প্রাচ্যের নৈতিকতা, রাজনীতি আর দর্শন প্রকৃতির ভিত্তিতে, প্রকৃতিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। এই দর্শনব্যবস্থার গুরুত্ব প্রতিফলিত হয়েছে কোরিয়া, জাপান আর ভিয়েতনামের দর্শনব্যবস্থায়। এমনকি তাদের জাতীয় পতাকাতেও (國旗) তা প্রতীকায়িত।55
প্রকৃতিকেন্দ্রিক দার্শনিক ভিত্তি গড়ে তোলার তত্ত্ব পাশ্চাত্যে উত্থাপিত হয় দুহাজার বছর পরে, আলোকায়নের যুগের গোড়ায়, বেকন, স্পিনোজা প্রমুখের হাতে। প্রত্যাদিষ্ট ধর্মের ঐতিহ্য থেকে বেরিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গেই তা সম্ভব হয়েছিল। দর্শনে প্রকৃতির গুরুত্ব বোঝাতে বেকন ঘোষণা করেন: “মানুষের বোধশক্তির জন্ম কেবল প্রকৃতি নিয়ে চিন্তা আর প্রকৃতি যে সত্য দেখায় তার পর্যবেক্ষণ থেকে। এর বাইরে মানুষ কিছুই জানতে পারে না, কিছুই করতেও পারে না।” স্পিনোজা আরও এগিয়ে ঘোষণা করেন, “ঈশ্বর আর প্রকৃতি অভিন্ন”।
ই চিং, দাওবাদ আর কনফুসীয় মতবাদের দার্শনিক সম্পর্ক দেখা যায় এখানে: মহাবিশ্ব আর মানুষের ঘটনাবলি নিয়ে ই চিং-এর দর্শনব্যবস্থা দাওবাদের অকর্মের চিন্তা আর কনফুসীয় মতবাদের নেতার চিন্তায় হুবহু প্রতিফলিত। কনফুসীয় নেতার চিন্তার মর্মকথা নৈতিকতার গুরুত্ব। বিধানের আগে নৈতিকতা, এটাই নেতার চিন্তার সূচনাবিন্দু। একই সঙ্গে দাওবাদের অকর্মের চিন্তা পাশ্চাত্যের কর্মের চিন্তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে ই চিং-এর পরিবর্তনের দর্শনের ওপর ভর করে। দাও চিরন্তন, অপরিবর্তনীয়, কারও অধিকারভুক্ত নয়; তাই তা নৈতিকতাকে পরমতা দেয়, আবার একই সঙ্গে কাউকে পরম নৈতিকতার দাবিদার হতে বা তা আবিষ্কারের দাবি করতে দেয় না। কনফুসীয় মতবাদ নৈতিকতার এই বৈশিষ্ট্যের ওপর জোর দেয়, আর এখানেই পাশ্চাত্যের ধর্মীয় মতবাদ থেকে তার বড় পার্থক্য। কনফুসিয়াস জোর দিয়ে বলেছিলেন, “রেন (仁)-এর প্রশ্নে গুরুকেও ছাড় দিতে নেই” (কথোপকথন, ১৫:৩৫), আর মেনসিয়াস ব্যাখ্যা করেছিলেন, “শু চিং-এর (書經, দলিলের গ্রন্থ) সব কথা হুবহু বিশ্বাস করার চেয়ে শু চিং না থাকাই ভালো” (মেনসিয়াস, ৭, “জিন শিন, দ্বিতীয় ভাগ”, 盡心章句下)। অন্যদিকে খ্রিস্টধর্ম এক সুস্পষ্ট বিধানের মধ্য দিয়ে বিধানের গুরুত্ব নিয়ে তার অবস্থান নিশ্চিত করে: “ঈশ্বরের বিধান দুটি। প্রথমটি ঈশ্বরের উপাসনা, দ্বিতীয়টি প্রতিবেশীকে নিজের মতো ভালোবাসা” (মার্ক ১২:৩০-৩১, মথি ২২:৩৬-৪০)। এর অর্থ, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সভ্যতা গড়ে উঠেছে যথাক্রমে নৈতিকতা আর বিধানকে কেন্দ্র করে।
নৈতিকতা আর বিধানের পার্থক্য এসেছে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সভ্যতার মৌলিক পার্থক্য থেকেই: দাও আর ঈশ্বর, অর্থাৎ অব্যক্ত আর ব্যক্তের পার্থক্য। দাওবাদ ই চিং-এর অন্তর্নিহিত মহাবিশ্ব, নৈতিকতা আর মানবস্বভাব বিষয়ক চিন্তাকে বিকশিত করে প্রকৃতির ভিত্তিতে মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক নিয়ে এক সামগ্রিক চিন্তাব্যবস্থা গড়ে তোলে। প্রকৃতি আর মানুষের সম্পর্ক নিয়ে ভাবনার ভার ই চিং-এর ইন ও ইয়াংয়ের চিন্তা আর দাওবাদের দাওয়ের চিন্তার হাতে ছেড়ে দিয়ে কনফুসীয় মতবাদ মন দিতে পেরেছিল নৈতিকতা আর রাজনৈতিক চিন্তায়। ই চিং-এর শুরু গণনার বই হিসেবে, কিন্তু মহাভাষ্য (繫辭傳)-এর মতো দার্শনিক ও চিন্তাগ্রন্থে তাকে প্রসারিত ও গভীর করার প্রয়াসের জোরে তা তাও তে চিং আর কথোপকথন-এর সঙ্গে মিলে বিশ্বতত্ত্বের স্তরে প্রাচ্যের প্রজ্ঞা ধরে রেখেছে। প্রাচ্যের ই চিং-এর প্রায় সমকালীন পাশ্চাত্যের প্রত্যাদিষ্ট ধর্মের সঙ্গে তুলনা করলে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সভ্যতার পার্থক্য অনুভব করা যায়। ঈশ্বরের দেওয়া কঠোর আইনের ওপর দাঁড়ানো ইহুদি ও খ্রিস্টধর্মের শাস্ত্রের সঙ্গে তুলনা করলে নৈতিকতার পটভূমিতে নিজের জোরে জীবনের পথ কেটে চলা প্রাচ্যের সভ্যতার মর্মের কাছাকাছি পৌঁছানোর সুযোগ মেলে।
ই চিং-এর ভিত্তি ভালো-মন্দ নয়, ইন ও ইয়াংয়ের ধারণা। অবিরাম বদলে চলা জগতে চিরন্তন সত্তার দর্শন বা ভালো-মন্দের তত্ত্ব খাটে না। ইন ও ইয়াংয়ের ধারণা স্থির নয়, গতিশীল। ইনের মধ্যে আছে ইয়াংয়ের বীজ, আর ইয়াংয়ের মধ্যে ইনের বীজ। দুটিরই স্বভাব হল পরস্পরের পরিপূরক হয়ে বদলে যাওয়া। এভাবে ই (易) সামনে আনে সত্তার দর্শনের ওপর দাঁড়ানো “আত্মকেন্দ্রিকতা” নয়, ইন ও ইয়াংয়ের তত্ত্বের “সম্পর্ককেন্দ্রিকতা”। এই দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গিই প্রাচ্যের সভ্যতার চিন্তার ভিত্তি জোগায়।
আদি ই চিং দাওবাদ আর কনফুসীয় মতবাদের জন্মের আগে, বসন্ত ও শরৎ এবং যুদ্ধরত রাজ্যসমূহের যুগের আগে, দুহাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে বিদ্যমান থেকে বদলেছে ও বিবর্তিত হয়েছে, আর প্রাচ্যের চিন্তার এক বড় ভিত্তি গড়ে তুলেছে। কনফুসিয়াসের রেখে যাওয়া একটি উপাখ্যান থেকে তা জানা যায়: “চামড়ার ফিতে তিনবার ছিঁড়ে গিয়েছিল” (韋編三絶)। কনফুসিয়াস এত মন দিয়ে ই চিং পড়েছিলেন যে বাঁশের পাতে লেখা ই চিং বেঁধে রাখার চামড়ার ফিতে তিনবার ছিঁড়ে গিয়েছিল। লক্ষ করা দরকার, ই চিং-এর ভিত্তি যে ষড়রেখ চিহ্ন (卦) আর রেখা (爻), লিপির উদ্ভাবনের আগে দীর্ঘকাল সেগুলো সংকেত আর প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এর অর্থ, প্রাচ্যের সভ্যতার আদিপর্বেই ই চিং প্রাচ্যের চিন্তা ও ধারণার ভিত্তি আর অভিমুখ স্থির ও দৃঢ় করে দিয়েছিল। অর্থাৎ সব বস্তুর পরিবর্তনকে কঠিন রেখা আর কোমল রেখা, অর্থাৎ ইন ও ইয়াংয়ের চিন্তা দিয়ে ব্যাখ্যা করার দর্শন, আর তার অন্তর্নিহিত প্রকৃতি-ভাবনা, ই চিং-এর মধ্য দিয়েই আগে থেকে প্রতিষ্ঠিত ছিল।
ই চিং কনফুসীয় মতবাদের সঙ্গে এতটাই গভীরভাবে যুক্ত যে কনফুসীয় পণ্ডিতদের আধিপত্যের যুগে প্রায়ই তা রাজকীয় পরীক্ষার বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত থাকত। এ কারণে ই চিং কনফুসীয় ধ্রুপদি গ্রন্থগুলোর একটি হয়ে ওঠে এবং কনফুসীয় মতবাদে গুরুত্বপূর্ণ স্থান পায়। অবশ্য কথোপকথন-এর মতো তাও তে চিং-এ ই চিং-এর সরাসরি উল্লেখ নেই, কিন্তু তাও তে চিং-এর এখানে-ওখানে এমন অনেক পঙ্ক্তি আছে, যাতে ই চিং-এর ভাবনা প্রতিফলিত। দাওবাদও ই চিং-এর সঙ্গে এতটাই গভীরভাবে যুক্ত যে শেষ পর্যন্ত ই চিং থেকে উদ্ভূত তাইজি-চিত্রকেই সে নিজের প্রতীক করে নেয়। শেষ পর্যন্ত ই চিং প্রাচ্যের সভ্যতার দুই বিশাল পর্বতমালা, কনফুসীয় মতবাদ আর দাওবাদের সাধারণ মহাবিশ্ব-ধারণা, মানবস্বভাবের তত্ত্ব আর নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির উৎস হিসেবে কাজ করে।
এখানে কাজের সময়টি গুরুত্বপূর্ণ। “অকর্মের বাছাই”-এর সন্ধান প্রতিফলিত করে এক কৌশলগত সিদ্ধান্ত: প্রথম পর্যায়েই উপযুক্ত কাজ করে অপ্রয়োজনীয় পরিশ্রম কমানো। এ এমন এক দর্শন অনুসরণ করে, যা ভবিষ্যৎ আঁচ করে, সেই অনুযায়ী আগেভাগে কাজ করে, ফলকে স্বাভাবিকভাবে, অকর্মের পথে ফুটে উঠতে দেয়। এই পদ্ধতি অপ্রয়োজনীয় শক্তির অপচয় সর্বনিম্ন রেখে দক্ষতা আর লক্ষ্য অর্জনে মনোযোগ দেওয়ার দিক দেখায়।
ই চিং-এর উদ্দেশ্য পরিবর্তনের প্রক্রিয়া লক্ষ করে যত আগে সম্ভব হস্তক্ষেপ করতে সাহায্য করা। প্রথম পর্যায়ই চূড়ান্ত। বদলে চলা পরিস্থিতিতে যত আগে হস্তক্ষেপ করা যায়, ধারাকে আয়ত্তে আনা তত সহজ। দেরিতে হস্তক্ষেপ বৃথা, কারণ ততক্ষণে সবকিছু ঘটে গেছে, কিছু করলেও আর ফল বদলানো যায় না 56
ই চিং পাশ্চাত্যেরও মনোযোগ কেড়েছিল। আলোকায়নের যুগে, অষ্টাদশ শতকের গোড়ায়, লাইবনিৎস ই চিং-এর চিন্তা ধরতে পেরেছিলেন; ১৮৩৫ সালে জার্মানিতে জেসুইট যাজক রেজিসের লাতিন ই চিং প্রকাশিত হয়; আর পরে কার্ল ইয়ুং গভীরভাবে ই চিং অধ্যয়ন করেন ও তাতে আগ্রহ দেখান। লাইবনিৎসের বিচারে প্রাচ্যের ই চিং আর ইন ও ইয়াংয়ের চিন্তা প্রকৃতিভিত্তিক এক সংকেতব্যবস্থার মাধ্যমে মানুষকে বাস্তব ও নৈতিক নির্দেশনা দেয়; ঝৌ ই-এর ষড়রেখ চিহ্নগুলো দেখে তিনি সেগুলোকে দ্বিমিক পদ্ধতির সঙ্গে যুক্ত করে পাশ্চাত্যের গণিতে প্রয়োগ করেন। ইন রেখা (--) ধরা যায় ০, আর ইয়াং রেখা (─) ১। কম্পিউটার-ব্যবস্থার মূল কলকৌশল হিসেবে ব্যবহৃত দ্বিমিক পদ্ধতি উদ্ভাবনে তিনি ই চিং থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন বলে জানা যায়।57